ডেস্ক রিপোর্ট

১৬ অক্টোবর ২০২২, ১২:৪০ পূর্বাহ্ণ

গাইবান্ধার আয়নায় কী দেখলাম কী শিখলাম

আপডেট টাইম : অক্টোবর ১৬, ২০২২ ১২:৪০ পূর্বাহ্ণ

শেয়ার করুন

রাজেকুজ্জামান রতন ::

গাইবান্ধার আয়নায় প্রতিফলিত হলো নির্বাচনী চেহারা। মানুষ সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে নিজেকে, আর তার পছন্দের তালিকায় যেসব জিনিস থাকে তাদের মধ্যে অন্যতম হলো আয়না। কে কবে আয়না বানানোর কৌশল আবিষ্কার করেছিল তা জানা না থাকলেও আয়নার ব্যবহার করতে আপত্তি নেই কারও। এমন মানুষ কি পাওয়া যাবে যিনি আয়নায় নিজেকে দেখতে চান না! আয়নায় মানুষ নিজেকে দেখেন। আয়নার সামনে হাসলে হাসির চেহারা, কাঁদলে কান্নার চেহারাই দেখা যায়। আয়না ভুল দেখায় না কিন্তু যে দেখে যে যদি আত্মপ্রেমে মগ্ন থাকে তাহলে নিজেকে সবচেয়ে সুন্দর দেখতে থাকে। কোনো খুঁত আর চোখে পড়ে না। মানুষের কাজও না কি আয়নার মতো। যার মধ্যে প্রতিফলিত হয় মানুষের চিন্তা। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও সমস্যাটা একই রকম। নিজের কাজের ভুল বা ত্রুটি দেখতে পান না এমনকি কাজ নিয়ে কোনো সমালোচনা শুনতে চান না সাধারণ মানুষ। কিন্তু যারা দায়িত্বে থাকেন তাদের তো সাধারণ মানুষের মতো হলে চলবে না। কারণ তাদের ভুল অসংখ্য মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে। নির্বাচন কমিশন তেমনি একটি দায়িত্বপূর্ণ জায়গা।

নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছিল গাইবান্ধায়, উপনির্বাচন। গাইবান্ধা-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী গত ২৩ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। স্বাভাবিকভাবেই তার মৃত্যুতে আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। এরপর তফসিল ঘোষণা এবং সে অনুযায়ী শুরু হয় নির্বাচন আয়োজন। শুরু থেকেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ নির্বাচন কমিশনে আসতে থাকে। এসব অভিযোগের নিষ্পত্তি করার খুব বেশি উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে। ফলে অসন্তোষ, সন্দেহ আর অবিশ্বাস দানা বাঁধতে থাকে ক্রমাগত। জাতীয় নির্বাচনের আর এক বছর বাকি। সার্বিক বিবেচনায় আওয়ামী লীগের জন্য এই নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার খুব গুরুত্বপূর্ণ এমন কোনো বিষয় ছিল না। কিন্তু ক্ষমতার দাপট বলে কথা!

গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের উপনির্বাচনে এই আসনে ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৭৪৩ জন। বহুল আলোচিত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) মাধ্যমে সব কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে এ সিদ্ধান্তের কারণে আগ্রহও ছিল প্রবল। আগ্রহ যতটা ভোটারদের মধ্যে এর চেয়েও বেশি ছিল পর্যবেক্ষকদের মধ্যে। নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন পাঁচজন। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও বিকল্প ধারার প্রার্থীরা দলীয়ভাবে নির্বাচন করেছেন। বাকি দুজন ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়নি।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে গাইবান্ধা-৫ আসনের ভোট পর্যবেক্ষণের মনিটরিং সেলে বসে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছিলেন। দুপুরবেলা সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, ‘গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।’ গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আপনারাও একটা সময় আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। আপনারা দেখেছেন। আমরা প্রথম থেকে লক্ষ করেছি, ভোটগ্রহণে অনিয়ম হচ্ছে। অনেক কেন্দ্রে আমরা গোপন ভোটকক্ষে অবৈধ অনুপ্রবেশ লক্ষ করেছি। অবৈধভাবে প্রবেশ করে ভোটারদের ভোট প্রদানে সহায়তা করছে, অথবা বাধ্য করছে। এটা আমরা সুস্পষ্টভাবে লক্ষ করেছি।’ কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘আমরা দেখেছি, সম্ভবত পোলিং এজেন্ট, তাদের গায়ের গেঞ্জিতে নির্বাচনের প্রতীক ছাপানো ছিল। মেয়েদের একই ধরনের শাড়ি নাকি একই রকমের ওড়না ছিল, যেটা নির্বাচন আচরণবিধি পরিপন্থী।’

সাংবাদিকদের কাছে সিইসি বলেন, ‘আমরা সহকর্মীরা সকাল ৮টা থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে এটি পর্যবেক্ষণ করেছি, আমরা কেউ কক্ষ ত্যাগ করিনি। অনিয়ম এবং অবৈধ কাজগুলো বেশ মোটা দাগে হয়েছে। যার ফলে আমরা প্রথমে তিনটি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দিয়েছি। এরপর ১৬টি কেন্দ্র এবং তৃতীয় দফায় আমরা ১২টি কেন্দ্র বন্ধ করেছি। চতুর্থ দফায় কটি এবং সর্বশেষ আরও তিনটি মোট ৪৩টি কেন্দ্রের ভোট বন্ধ করে দিয়ে আমরা সাড়ে ১২টায় পর্যবেক্ষণ কক্ষ ত্যাগ করেছি। এ সময় আমরা অফিসারদের দায়িত্ব দিয়ে এসেছি। এ সময় আমরা লক্ষ করলামআমাদের কতগুলো কেন্দ্রে সিসিটিভি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে আমরা তথ্য সংগ্রহ করতে পারছিলাম না।’

তিনি আরও বলেন, ‘কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণের প্রেক্ষাপটে পরে আমরা আরও সাতটি ভোটকেন্দ্র বন্ধ করি। ৫০টি ভোটকেন্দ্র বন্ধ করা হয়। এ ছাড়া রিটার্নিং অফিসারও একটি কেন্দ্রে ভোট বন্ধ করেন। বিষয়টি আমরা কমিশনের সব সদস্য বসে পর্যালোচনা করতে থাকি। আমরা বিচার-বিশ্লেষণ করতে থাকি। আমরা নিশ্চিত হই৫০টি কেন্দ্রের ভোট বন্ধ হয়ে গেলে বাকি যেসব কেন্দ্র থাকে, সেখানকার পরিবেশ বিচার করে সঠিক মূল্যায়ন হবে না।’

এসব দেখে সিইসি বলেন, ‘আমাদের কাছে মনে হয়েছে ভোটগ্রহণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। কোনো একটি পক্ষ বা কোনো একটি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী প্রভাবিত করতে পারছেন। ফলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে ইমপার্শিয়ালি, ফেয়ারলি ভোটগ্রহণ হচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘৫০টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ বন্ধের পর আইনকানুন পর্যালোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আরপিওর ৯১ অনুচ্ছেদে যে দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া হয়েছে।’ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে প্রদত্ত ক্ষমতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আরপিওর ৯১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কমিশনের কাছে যদি প্রতীয়মান হয় ভোটগ্রহণ সঠিকভাবে হচ্ছে না, ফেয়ারলি হচ্ছে না, তাহলে নির্বাচন কমিশন সব ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দিতে পারে। আমরা পরিশেষে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পুরো নির্বাচনী এলাকা গাইবান্ধা-৫-এর ভোট কার্যক্রম আমরা বন্ধ করে দিয়েছি। এই সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত রিটার্নিং অফিসারকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওখানে এখন আর ভোট হচ্ছে না। পরবর্তীকালে আমরা দেখব বিধিবিধান অনুযায়ী কী করতে হবে। আমরা কমিশন বসে আইনকানুন পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।’

দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে ম্লান হাসি মুখে নিয়ে তিনি বলেন, ‘আইন ভঙ্গ করে গোপন কক্ষে প্রবেশ করে ভোট দিয়ে দিতে আমরা স্বচক্ষে দেখেছি।’ ইভিএম সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ইভিএমেরও কোনো ত্রুটি দেখতে পাচ্ছি না। ওই যে মানবিক আচরণ, আরেকজন ঢুকে যাচ্ছে, দেখিয়ে দিচ্ছে। এটা সুশৃঙ্খল নির্বাচনের পরিপন্থী। এরাই ডাকাত, এরাই দুর্বৃত্ত। যারাই আইন মানছেন না তাদেরই আমরা ডাকাত-দুর্বৃত্ত বলতে পারি। কারণ আইনের প্রতি সবাইকে শ্রদ্ধা করতে হবে। সবাই যদি আইন না মানি, নির্বাচন কমিশন এখানে বসে সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে পারবে না।’

নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে কেন চলে গেল, এ রকম এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে অনেকটা। আমরা দেখতে পাচ্ছি, আপনারাও দেখতে পাচ্ছেন। গোপন কক্ষে অন্যরা ঢুকছে, ভোট সুশৃঙ্খলভাবে হচ্ছে না। তবে কেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল, তা আমরা এখনো বলতে পারব না।’ হয়তো তিনি দায়িত্ব শেষ করার আগে কখনোই সেটা বলতে পারবেন না। আর কেই বা বলবে? ডিসি, এসপি? কয়েকদিন আগেই তারাও তো নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে হইচই করে তাদের অবস্থান জানান দিয়েছেন। গাইবান্ধা নির্বাচনে তাদের ভূমিকা এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তারা নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা কতটুকু মানবেন তা নিয়েও সন্দেহ আছে। প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে যে, নির্বাচন কমিশনের কর্তাব্যক্তিরা কতখানি নিরপেক্ষ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন? ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে বাড়তি লোকজন ঢুকে পড়ল কীভাবে? বাধা দেওয়ার দায়িত্ব কার ছিল? তারা দায়িত্ব পালন করতে পারেননি কেন? প্রিসাইডিং অফিসাররা কি কোনো অভিযোগ করেছেন? পুলিশের এসপি বলেছেন তিনি কোনো সমস্যা দেখেননি। জনগণ কিন্তু সব দেখেছেন এবং কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে গণমাধ্যমেও কথা বলেছেন। জনগণের এই কথা শুনবে কি কেউ?

গাইবান্ধার এই আসনে ইভিএমের মাধ্যমে ১৪৫টি কেন্দ্রে ৯৫২টি বুথে ভোটগ্রহণ করা হয়। নির্বাচনের দিন ভোটারদের নিরাপত্তা দিতে কয়েক প্লাটুন র‌্যাব, আনসার সদস্য ছাড়াও ১ হাজার ২৮৫ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু তারা জনগণের ভোটাধিকার রক্ষা করতে পেরেছেন তা দৃশ্যমান হলো না। এই প্রশ্ন ওঠা কি স্বাভাবিক নয় যে একটি আসনে উপনির্বাচন করতে গিয়ে ইভিএমের দুর্বলতা, সিসি ক্যামেরার অকার্যকারিতা, প্রশাসনের দায়িত্ব পালনের অনীহা বা অক্ষমতা, পুলিশের ভূমিকা যেভাবে ফুটে উঠল সেখানে ৩০০ আসনে নির্বাচন কীভাবে সামাল দেবে নির্বাচন কমিশন? যদিও ২০০৮ সালের তুলনায় পুলিশ বাহিনীর সদস্য অনেক বেড়েছে, তখন ছিল লাখখানেক, এখন পুলিশ বাহিনীর সদস্য দাঁড়িয়েছেন ২ লাখ ১২ হাজার। কিন্তু গাইবান্ধা-৫ আসনের মতো পুলিশ মোতায়েন করতে হলে পুলিশের প্রয়োজন হবে ৩ লাখ ৮৫ হাজার। আরও দেড় লাখের বেশি পুলিশ পাওয়া যাবে কীভাবে? ভোটকেন্দ্রের মানবিক (!) সহায়তাকারীদের নিয়ন্ত্রণ করা যাবে কীভাবে? প্রতিপক্ষকে হুমকি দিয়ে ভোটকেন্দ্রে আসা বন্ধ করার যে ভীতিকর পরিস্থিতি সেখানে সাধারণ ভোটারদের ভরসা দেওয়া যাবে কীভাবে?

অনেকগুলো সন্দেহকে বাস্তবে রূপ দিয়ে গাইবান্ধার নির্বাচন সরকারদলীয় প্রার্থীর দাপট, প্রশাসনের দুর্বলতা আর নির্বাচন কমিশনের অসহায়ত্ব দেখিয়ে দিল। ইভিএম নিয়ে আলোচনার সময় একজন নির্বাচন কমিশনার বলেছিলেন, চ্যালেঞ্জ হলো ওই লোকটা যে কেন্দ্রের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকে। গাইবান্ধা উপনির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের সেই চ্যালেঞ্জ আবার দেখা দিল কিন্তু মোকাবিলা করা গেল না। নির্বাচন কমিশন তার শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করে নির্বাচন বন্ধ করল, এতে নির্বাচন কমিশনের দৃঢ় অবস্থানের পরিচয় পাওয়া গেল। কিন্তু ভবিষ্যৎ নির্বাচনের সংশয় তো গেল না। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা, নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলা এসব প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব হবে কি? ভবিষ্যতের স্বার্থে গাইবান্ধার শিক্ষা মনে রাখা তাই জরুরি।

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট

শেয়ার করুন