ডেস্ক রিপোর্ট
২২ এপ্রিল ২০২২, ১০:১৭ অপরাহ্ণ
অধিকার ডেস্ক:: শ্রমিক কৃষক ও মেহনতীদের ঘাড় ভেঙে পুঁজিপতি সুবিধাবাদী জার শাসকরা যখন চরম শোষণ চালাচ্ছিল ঠিক সে সময় রাশিয়ার মহানদী ভলগার তীরে সিমবির্স্ক শহরে জন্ম নেন রুশ বিপ্লবের মহানায়ক কমরেড ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন।
দিনটি ছিল ১৮৭০ সালের ২২ এপ্রিল।
মূল নাম ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়নভ (Vladimir Ilyich Ulyanov)। ছদ্মনাম লেনিন। তবে বিশ্বজুড়ে লেনিন নামেই সর্বাধিক পরিচিত।
মার্কসবাদ-লেলিনবাদ তত্ত্বের প্রবক্তা লেনিন ছিলেন রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, বলশেভিক বিপ্লবের নেতা এবং সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র রাষ্ট্রের প্রথম প্রধান। যার শাসনের অধীনে রাশিয়ায় বৃহত্তর সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিস্ট পার্টি দ্বারা পরিচালিত একদলীয় সাম্যবাদী রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের সময় তার পরিচিতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই বিপ্লবে রাশিয়ায় শতাব্দীর সাম্রাজ্যবাদী শাসনের অবসান ঘটে।
লেনিন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তার বাবা ইলিয়া নিকোলায়েভিচ উইলিয়ানভ ছিলেন মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক। মা-মারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা পড়াশোনা করেন বাড়ীতে। কয়েকটি বিদেশী ভাষা জানতেন, সাহিত্যে তার ভালো দখল ছিল।
ইলিয়া ও মারিয়া উইলিয়ানভ পরিবারে ছেলেমেয়ে ছিল মোট ছয় জন। বাবা-মা তাদের জন্য বহুমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। পাঁচ বছর বয়সেই ভ্লাদিমির পড়তে শেখে, নয় বছর বয়সে ভর্তি হয় সিমবির্স্ক জিমনেসিয়মের প্রথম শ্রেণীতে। পড়াশোনায় ভ্লাদিমির ছিলেন খুবই মনোযোগী। অনেক পড়াশোনা করেন ভ্লাদিমির । রুশ মহান লেখকদের রচনা তার পাঠ্য সম্ভারে জড়িয়ে ছিল। তার পঠিত সাহিত্যের মধ্যে একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল বিপ্লবী গণতন্ত্রী লেখকরা। এদের অনেকের লেখা তখন নিষিদ্ধ ছিল তবু ভ্লাদিমির তা বাদ দেননি।
তিনি কাজান ইম্পেরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার হন। বহিষ্কারের পর, লেনিন জার্মান দার্শনিক এবং সমাজতন্ত্রবাদী কার্ল মার্ক্স এর রাজনৈতিক মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হন। ১৮৮৯ সালে নিজেকে মার্কসবাদী হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৮৯১ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পাস করে সেখানেই আইন চর্চা শুরু করেন।
তিনি মার্কসবাদী কার্যকলাপে জড়িত থাকার অপরাধে গ্রেপ্তার হন। সাইবেরিয়ায় তাকে নির্বাসন দেওয়া হয়। লেনিন সেখান থেকে জার্মান এবং তারপর সুইজারল্যান্ডে চলে যান। সেখানে তিনি অন্যান্য ইউরোপীয় মার্কসবাদীদের সঙ্গে দেখা করেন।
১৯১৪ সালের আগস্টে মিত্রশক্তি জোটের সমর্থনে রাশিয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদান করে। সামরিকভাবে সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার সঙ্গে আধুনিক ও শিল্পোন্নত জার্মানির কোন মিল ছিল না। তাই যুদ্ধে রাশিয়ার হতাহতের সংখ্যা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি ছিল। এছাড়া খাদ্য ও জ্বালানির অভাব রাশিয়াকে বিশালভাবে জর্জরিত করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার পরাজয়ে, লেনিন তার রাজনৈতিক বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করেন। এই সময়েই তিনি সাম্রাজ্যবাদ, দ্য হাইয়েস্ট স্টেজ অফ ক্যাপিটালিজম (১৯১৬) গ্রন্থটি লিখেন। যেখানে তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, যুদ্ধ হচ্ছে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের স্বাভাবিক ফলাফল।
১৯১৭ সালের এপ্রিলে রুশ বিপ্লব শুরু হয়। মার্চে খাদ্য ঘাটতির কারণে ধর্মঘট হলে জার নিকোলাস দ্বিতীয় পদত্যাগ করেন। ফলস্বরুপ, রাশিয়ার শতাব্দীর সাম্রাজ্য শাসনের অবসান ঘটে। রুশ বিপ্লবের পর, রাশিয়া একটি অস্থায়ী সরকারের অধীনে আসে। যারা সামাজিক সংস্কারের বিরোধিতা করে এবং ১ম বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখে। লেনিন অস্থায়ী সরকারকে উৎখাতে নামেন। লেনিনের কাছে অস্থায়ী সরকার ছিল ‘বুর্জোয়াদের একনায়কত্ব’।
লেনিন নতুন সরকারের নেতৃত্বের শূন্যতাকে উপলক্ষ্য করে ক্ষমতা দখলের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কারখানার শ্রমিক, কৃষক, সৈনিক এবং নাবিকদের স্বেচ্ছাসেবি রেডগার্ডসকে আধাসামরিক বাহিনীতে রুপান্তরিত করেন। ১৯১৭ সালের নভেম্বরে রেড গার্ডস এক রক্তহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অস্থায়ী সরকারি ভবন দখল করে।
বলশেভিকরা রাশিয়ার ক্ষমতা দখল করার মাধ্যমে সোভিয়েত শাসনের ঘোষণা করে। লেনিন বিশ্বের প্রথম কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের নেতা হিসেবে সোভিয়েত সরকারের প্রধান হন। নতুন সোভিয়েত সরকার প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার সম্পৃক্ততার অবসান ঘটায়।
বলশেভিক বিপ্লবে রাশিয়া তিন বছরের এক গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এই সময়ে, লেনিন ‘যুদ্ধ কমিউনিজম’ নামে একটি অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন করেছিলেন। ওয়ার কমিউনিজমের অধীনে, লেনিন দ্রুত সোভিয়েত রাশিয়া জুড়ে সমস্ত উত্পাদন এবং শিল্পকে জাতীয়করণ করেছিলেন। তিনি তার সেনাবাহিনীকে খাওয়ানোর জন্য কৃষকদের কাছ থেকে উদ্বৃত্ত শস্য আহরণ করেছিলেন।
লেনিনের এই ব্যবস্থাগুলো ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন নতুন অর্থনীতির অধীনে শিল্প এবং কৃষি উৎপাদন দ্রুত হ্রাস পায়। ১৯২১ সালে আনুমানিক পাঁচ মিলিয়ন রাশিয়ান দুর্ভিক্ষে মারা যায় এবং রাশিয়া জুড়ে জীবনযাত্রার মানের পতন হতে শুরু করে। সরকারকে হুমকির মুখে ফেলে দেয় । ফলে লেনিন আরেকটি অর্থনৈতিক নীতি প্রতিষ্ঠা করেন। নতুন অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে বাজারমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করে, যা ছিল রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত ‘একটি মুক্ত বাজার’ এবং ‘পুঁজিবাদ ব্যবস্থা’।
লেনিনের সেনাবাহিনী (রেড আর্মি) শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার গৃহযুদ্ধে জয়লাভ করে। ১৯২২ সালে বলশেভিক বিপ্লবের পর, রাশিয়া, ইউক্রেন, বেলারুশ, জর্জিয়া, আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজান এর সাথে একটি চুক্তির মাধ্যমে ইউনিয়ন অব সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (ইউএসএসআর) গঠন করে।
লেনিন নবগঠিত ইউনিয়ন অব সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র এর প্রধান হন। কিন্তু সেসময় তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। ১৯২৩ সালের মার্চের গোড়ায় লেনিনের শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে আসে। মে মাসে উনি গোর্কিতে ফিরে যান। অবশেষে ১৯২৪ সালের ২১ জানুয়ারি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ফলে মারা যান লেলিন।
২৩ জানুয়ারি লেলিনের শবাধার গরইক থেকে মস্কোয় এনে ইউনিয়ন ভবনের সভা কক্ষে রাখা হয়। সকল স্তরের নর-নারীরা স্তম্ভ কক্ষের ভিতর দিয়ে প্রদক্ষিণ করে লেলিনকে তাদের শেষ শ্রদ্ধা জানান।
২৭ জানুয়ারি বিকাল চারটায় লেলিনের সমাধি অনুষ্ঠান শুরু হয়। ক্রেমলিনে স্থাপিত হয় লেলিনের দেহ। তখন সমস্ত কাজ পাঁচ মিনিটের জন্য থেমে গেল মোটর, ট্রেন, বন্ধ হলো কলকারখানার কাজ। পেত্রগ্রাদের নাম হলো লেনিন গ্রাদ। সেদিন গভীর শোক নিয়ে এভাবেই প্রাণের নেতাকে চির বিদায় জানান সোভিয়েত জনগণ।