ডেস্ক রিপোর্ট

২৬ মার্চ ২০২২, ৯:২৪ অপরাহ্ণ

স্বাধীনতার ৫১ বছর: ‘বিচার নাই, কার কাছে চাইব’

আপডেট টাইম : মার্চ ২৬, ২০২২ ৯:২৪ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

আবু নাসের অনীক::

দেশে যখন ৫১তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হচ্ছে ঠিক তার দুুদিন পূর্বে ২৪ মার্চ ২০২২ সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হলেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা জাহিদুল ইসলাম। একইসাথে ঐ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে খুন হলেন কলেজ ছাত্রী প্রীতি। কোন ধরনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা না থাকা সত্বেও দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির প্রভাবে সংঘটিত ঘটনায় তাকে প্রাণ দিতে হলো। স্বাধীনতার মধ্য বয়সে এসে ‘আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই, আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ন নৃত্য দেখি’। কন্যাহারা শোকার্ত এক বাবা আক্ষেপভরা কণ্ঠে বলেন,‘বিচার নাই, কার কাছে চাইব’।

একটি অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুুক্তি পাবার প্রত্যাশায় ৩০ লাখ শহীদ তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। পরিতাপের বিষয়, তাদের রক্তে অর্জিত এই দেশ যারা ৫০ বছর ধরে শাসন করেছে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পরিপূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বরং বলা চলে, উত্তরাধিকার সূত্রে তৎকালিন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর তারা পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে। অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবাহান তাঁর ‘বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ বই এ লিখেছেন, ‘গণমানুষের এই সর্বাত্বক অংশগ্রহণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে একধরনের অন্য অধিকাংশ সংগ্রাম থেকে স্বাতন্ত্র্য এনে দিয়েছে। ঠিক এ কারণেই এ দেশে এমন একটা সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দরকার ছিলো, যেখানে এই মানুষগুলো তাদের অবদানের স্বীকৃতি পায় এবং তারা একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। তার পরিবর্তে আমরা এমন এক সমাজ গড়ে তুললাম, যা উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা যে সমাজটি পেয়েছিলাম তার চেয়েও অধিক বৈষম্য পিড়িত’।

প্যারিসের ওয়ার্ল্ড ইনইক্যুয়ালিটি ল্যাব কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদন ‘ওয়ার্ল্ড ইনইক্যুয়ালিটি রিপোর্ট-২০২২’ এ বলা হচ্ছে, ‘২০২১ সালে বাংলাদেশের মোট জাতীয় আয়ের ১৬.৭% মাত্র ১% মানুষের হাতে কুক্ষিগত। অন্যদিকে নিচু তলার ৫০% মানুষের হাতে আছে মোট আয়ের ১৭.১%। বাংলাদেশের মোট জাতীয় আয়ের ৪৪% আছে ১০% মানুষের হাতে। স্বাধীনতার অর্জন বলে কথা!!

১৬ মার্চ ২০২২ প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ি, ২০২১ সালের ডিসেম্বর শেষে কোটি টাকার বেশি আমানত রেখেছে এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এখন ১ লাখ ১ হাজার ৯৭৬। ২০২০ এর ডিসেম্বরে এই সংখ্যা ছিলো ৯৩ হাজার ৮৯০, অর্থাৎ এক বছরে বেড়েছে ৮ হাজার ৮৬ টি। মহামারির ২১ মাসে কোটিপতির হিসাব বেড়েছে ১৯ হাজার ৩৫১ টি। ১৯ ডিসেম্বর ২০২১ ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গর্ভন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এবং পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার যৌথ সমীক্ষায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে করোনার কারণে দেশে নতুন করে ২২.৯% মানুষ গরীব হয়েছে। নতুন ও পুরাতন মিলে জনসংখ্যার ৪৩% মানুষ দরিদ্রসীমার নিচে নেমে গেছে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটি অন্যতম রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিলো অর্থনৈতিক বৈষম্য বিলোপের মাধ্যমে সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। ৫১ বছরে এসে উপরের উল্লেখিত পরিসংখ্যান কী বলছে? ’৭১ পূর্ববর্তী সময়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ব্যবসায়ী-ভূস্বামীদের সাথে দ্বন্দ্ব ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানী ব্যবসায়ী-ভূস্বামী শ্রেণীর। সেই সময়ে সমগ্র পাকিস্তানের ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সকল অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করতো ২২ পরিবার। এই ২২ পরিবারের মধ্যে ২ পরিবারের অবস্থান ছিলো পূর্ব পাকিস্তানে। পশ্চিম পাকিস্তানের এই ২০ পরিবার কর্তৃক এই দুই পরিবার চরমভাবে কোনঠাসা হয়ে থাকতো।

অর্থনৈতিক সকল কর্মকান্ড কেন্দ্রীভূত ছিলো পশ্চিম পাকিস্তান কেন্দ্রিক। এই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণও অধীনস্থ ছিলো পশ্চিমের হাতে। তাদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ জনগণের উপরে শোষণ-নির্যাতন চাপিয়ে দিয়েছিলো। এ দেশের সাধারণ জনগণ এ কারণে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর প্রতি ছিলো ভীষণভাবে ক্ষুদ্ধ। তারা প্রতিনিয়তো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার হতে বঞ্চিত হতো। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে শোষণের এই নিগড় থেকে বের হবার তীব্র আকাঙ্খা তৈরি হয়।

এমন প্রেক্ষাপটে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ছিলো একটি অনিবার্য বিষয়। এই যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ ছিলো না। লক্ষ প্রাণ, মা-বোনের সম্ভ্রমহানীর বিনিময়ে, হাজার হাজার মানুষের পঙ্গুত্ব বরণ করার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের জন্ম। জনগণের চোখে স্বপ্নের ঝলকানি। কিন্তু প্রথমেই হোঁচট খেতে হলো! দেশকে ঘোষণা করা হলো ‘গণপ্রজাতন্ত্রী’। সংবিধান রচনা করা হলো একজন রাজার কথা মাথায় রেখে! ’৭১ পূর্ববর্তী সময়ে জনগণ ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানের প্রজা, তবে এবার যেটি হলো, যে দেশ সে তার নিজের রক্তের বিনিময়ে অর্জন করলো সে দেশেই সে হয়ে গেলো প্রজা!! ৫১ বছর পরে এসেও তার অবস্থানের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। দেশের মালিক হয়ে ওঠা আর হলো না।

তাঁদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করছে এ দেশের লুটেরা ধনীক শ্রেনীর শাসকগোষ্ঠী। এই গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্যই যতো আয়োজন। উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে দেশ। সেতু, তাপ ও পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র, মেট্রো রেলসহ বিভিন্ন মেগা প্রজেক্ট। এক একটি প্রজেক্ট ঘিরে হাজার কোটি টাকার লুটপাট! এই ইট-কাঠ-পাথরের উন্নয়নকে কেন্দ্র করে কিছু মানুষের কোটিপতি হয়ে যাওয়ার উন্নয়নকেই স্বাধনিতার অর্জন বিবেচনায় মুখে ফেনা তুলে ফেলছে সরকারী দল। প্রশ্ন, উন্নয়নের সুফল ভোগ করছে কে? বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী কী এই উন্নয়নের অংশীজন?

আয় বৈষম্য, ধনী-গরীবের মধ্যে পার্থক্য, সামাজিক সাম্য বিষয়গুলি প্রকৃত ও টেকসই উন্নয়নের এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত। এই পূর্বশর্তগুলি স্বাধীনতার ৫১ বছরেও কার্যকর হয়নি। উন্নয়নকে তখনই উন্নয়ন হিসাবে বিবেচনা করা যায় যখন সেটি হয় ‘অন্তর্ভূক্তিমূলক’। যেখানে অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়ন ঘটে সেখানে লুটপাট সংঘটিত হয়না, ক্রমশই কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া গাণিতিকভাবেও সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের জিডিপি অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে, মাথাপিছু আয় (তথাকথিত) বেড়ে গেছে, বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকে দেশ তরতর করে এগিয়ে চলেছে। বিশ্বের সামনে একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশ হিসাবে বাংলাদেশ চিহ্নিত হচ্ছে। শাসকগোষ্ঠী এভাবেই স্বাধীনতা দিবসকে সেলিব্রেশন করছে! অন্যদিকে ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের ‘বৈশ্বিক আইনের শাসন সূচক-২০২১’ এ, ১৩৯ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৪তম। সার্ফশার্ক এর ‘ডিজিটাল কোয়ালিটি অব লাইফ ইনডেক্স-২০২১’ এর প্রতিবেদন অনুসারে ডিজিটাল জীবনমানে পৃথিবীর ১১০ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১০৩তম। আইটিইউসি’র ‘গ্লোবাল রাইটস ইনডেক্স-২০২১’ এর প্রতিবেদনে শ্রমিকের অধিকার বিবেচনায় বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ ১০ দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। সুইডেন ভিত্তিক ভ্যারিয়াস ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের গণতন্ত্রের সূচক-২০২১ এর প্রতিবেদনে বিশ্বের ১৭৯ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৫৪তম। দেশের বর্তমান শাসন ব্যবস্থা ‘নির্বাচিত একনায়কতন্ত্র’ বিভাগে স্থান পেয়েছে। ‘দ্য গ্লোবাল ফ্রি এক্সপ্রেশন রিপোর্ট-২০২১’ এর প্রতিবেদন অনুসারে ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতায়’ সবচেয়ে তলানিতে থাকা ৫ টি দেশের একটি বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের সৃষ্টিলগ্ন থেকেই কর্তৃত্ববাদী শাসনের সূচনা হয়। স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকার হরণ করা হয়। রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। রাতারাতি একটি লুটেরাগোষ্ঠী তৈরি হয়। বর্তমানে এই গোষ্ঠীই রাজনৈতিক কর্তৃত্বের নিয়ন্ত্রক হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে। ’৯০ পরবর্তী তথাকথিত সংসদীয় গণতন্ত্রের সূচনা করলেও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় একজন ব্যক্তির করায়ত্বে। যা স্বাধীনতার চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক। সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিপরিতে প্রতিষ্ঠিত হয় তথাকথিত নির্বাচনে নির্বাচিত রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্রের। লুটেরা ধনীক শ্রেণীর দলগুলির পরস্পর পরস্পরের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে নির্বাচন ব্যবস্থাপনাকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আবির্ভাব ঘটলেও বর্তমান সরকার ‘ক্ষমতাতন্ত্রের-লুটপাটতন্ত্রের’ চীরস্থায়ী বন্দোবস্ত স্বরুপ এই ব্যবস্থাকে বাতিল করে। আগে শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে লুটপাট করলেও বর্তমান সরকার এখন আর ভাগাভাগি তত্ত্বে বিশ্বাসী না!

স্বাধীনতার ৫১ বছরের অন্যতম অর্জন যুদ্ধাপরাধীর, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকন্ডের বিচার সম্পন্ন করা। এর মাধ্যমেই তারা বলতে চায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে। অথচ ৭২-৭৪ পর্যন্ত যে ৩০ হাজার বামপন্থী কর্মীকে হত্যা করা হয়েছিলো তার বিচার আজো হয়নি! এমনকি এই বিচারের দাবি তুলতেও কেউ কোন আওয়াজ করেনা। সেদিন যে বিনাবিচারে হত্যাকান্ডের, গুমের সূত্রপাত ঘটেছিলো স্বাধীনতার ৫১ বছর পরেও তা সংঘটিত হচ্ছে। ভিন্নমতালম্বী হবার কারণে লেখককে জেলের অভ্যন্তরে প্রাণ দিতে হচ্ছে। ভিন্নমতকে দমন করার জন্য আইন করা হয়েছে। রাজনীতিতে সম্প্রদায়িকতা গেড়ে বসেছে।

বিদ্যমান রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তন ব্যতীত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। নির্লজ্জ আমাদের লুটেরা শাসকগোষ্ঠী! এদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তোলাই আশু কর্তব্য। ‘প্রতিরোধ’ ই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয় সকল স্বৈরশাসকই গণপ্রতিরোধে খড়কুটোর মতো ভেসে যায়। জনগণের প্রতিরোধ গড়ে উঠবেই, কারণ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্মই হয়েছে ‘প্রতিরোধ’ করার মধ্যে দিয়েই!!

শেয়ার করুন