ডেস্ক রিপোর্ট

১০ ডিসেম্বর ২০২১, ১১:৪৫ অপরাহ্ণ

‘স্বাধীনতার আকাঙ্খা ও চেতনার সাথে প্রতারণা করেই চলছে শিক্ষা ব্যবস্থা’

আপডেট টাইম : ডিসেম্বর ১০, ২০২১ ১১:৪৫ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

অধিকার ডেস্ক:: অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে আজ বাংলাদেশের অর্জনগুলোর মোহমুক্ত পর্যালোচনার কোন পথ সরকার খোলা রাখেনি। বর্তমানে সরকারের একমাত্র কাজ হয়ে দাড়িয়েছে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে তার জয়গান গাওয়া, এবং বন্দনা ছাড়া ভিন্ন কোন কথা বললে তার ওপর খরগহস্ত হওয়া।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট আয়োজিত স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা শীর্ষক আলোচনাসভায় অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এই কথা বলেন।

আজ শুক্রবার (১০ ডিসেম্বর ২০২১) বিকাল ৩ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনাসভায় সভাপতিত্ব করেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আল কাদেরী জয় ও সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্স।

আলোচনা সভায় আলোচক হিসেবে ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কাউন্সিল প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক মুক্তা বাড়ৈ, সদস্য সচিব শোভন রহমান।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, গত ৫০ বছর ধরে যে শাসকই ক্ষমতায় এসেছেন, তারাই শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈরাজ্য চালিয়েছেন। নৈরাজ্যের সাথে তারা যুক্ত করেছেন বাণিজ্যকে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে ব্যয় ক্রমান্বয়ে আকাশচুম্বি হচ্ছে। ফলে এটা স্পষ্ট যে, শাসকগোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের সকল চেতনা ও আকাঙ্খার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। প্রতিশ্রুতি ছিল বৈষম্যহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করার, অথচ ক্রমাগত বৈষম্য বাড়ছে। আমাদের দেশের মন্ত্রী,এমপিরা কথায় কথায় বলেন বাংলাদেশ ইউরোপ, অ্যামেরিকার মত উন্নত হয়ে যাচ্ছে, অথচ সেখানকার শিক্ষা ব্যবস্থার কথা সামনে আনতে চান না। যুক্তরাষ্ট্রে খুব কম সংখ্যক স্কুল বাদে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সকল স্কুল পাবলিক এডুকেশন সিস্টেমের অন্তর্গত। তাদের শিক্ষার্থীদের পরিবহনের জন্য বিনামূল্যে আলাদা বাস সার্ভিসও আছে, আর আমাদের সরকার হাফ ভাড়াও কার্যকর করতে নারাজ। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে জাতীয় গবেষণায়, নীতি প্রণয়নের কোন সম্পর্ক নেই। তাহলে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আছে কি করতে? আবরারের মত প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থীদেরকে মেরে ফেলতে? বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন সরকারি দলের লোকদের চাকরি প্রদানকেন্দ্রে পরিণত হয়ে গেছে।

কমরেড বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, আমাদের দেশের শিক্ষানীতি, স্বাস্থ্যনীতি সহ কোন নীতিই আমাদের দেশের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে প্রণয়ন করা হয়না। বিভিন্ন দেশি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অনুদানের টাকা তসরুফ করতেই একেকবার একেকভাবে এক এক নিয়ম চালু করে আর বাতিল করে। খুব ধুমধাম করে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। তখন পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো, আয়োজন বিবেচনায় না নেওয়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরকে ব্যপক ভোগান্তিতে ফেলেছিল, গাইডবই বিক্রি কমার বদলে গাইড ও কোচিং বাণিজ্য বেড়ে গিয়েছিল। এখন যখন তাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, এখন শিক্ষাক্রম ২০২০ এ সে পদ্ধতি বাতিল করার কথা বলা হচ্ছে। যে সরককারই ক্ষমতায় আসুক, তারা ক্ষমতার বাইরে গেলেই বলে তাদের নীতি নাকি বাস্তবায়ন করার সময়ই পায়নি। বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার তো গত ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায়। তারাও কেন তাদের প্রণিত ২০১০ সালের শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে পারলো না? মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল সর্বজনীন, বিজ্ঞানভিত্তিক, সেক্যুলার শিক্ষার আকাঙ্খা নিয়ে। অথচ কোন শাসকগোষ্ঠী তা বাস্তবায়ন করেনি, করতে চায়নি। শিক্ষা পরিচালিত হচ্ছে সাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারণার ভিত্তিতে। রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্ভাবনী ও গবেষণামূলক কাজকে নিরুৎসাহিত করা হয়, বরাদ্দ শুন্যের কোটায়। প্রযুক্তি বিদেশ থেকে কিনে আনাতেই তাদের লাভ, এতে লুটপাটের মহোৎসব বজায় রাখা যায়। দেশি বিদেশি কর্পোরেট হাউজগুলোর হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ভার তুলে দেওয়া হচ্ছে। তাদের অর্থায়নে ডিপার্টমেন্ট এসি হচ্ছে, আসবাবপত্র আধুনিক হচ্ছে, কিন্তু গবেষণা হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধীরে ধীরে এইসমস্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। উপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীরা যে দৃষ্টিভঙ্গীতে শিক্ষাকে দেখতো, স্বাধীন দেশের শাসকগোষ্ঠীরাও একই দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে। তারা তাদের পুঁজিবাদী শাসন-লুণ্ঠনকে অব্যাহত রাখার উদ্দেশ্যেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাজিয়েছে, এই শিক্ষা ব্যবস্থা জনগণের কথা ভাবে না।

কমরেড রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, আজকে ডিজিটাল বাংলাদেশের নাম করে আমরা ডিজিটাল প্রতারণার ফাঁদে পড়ে গেছি। এর কারণ হচ্ছে, আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার মর্মবস্তুকেই ধ্বংস করে দিয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে যতগুলো শিক্ষানীতি প্রণিত হয়েছে, আমরা পাতা উলটে দেখতে পাবো, সবগুলোতে একই কথাই লেখা আছে, শুধু মোড়কটা পাল্টে। সেই কথা হচ্ছে, শিক্ষাকে শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের হাতের নাগালের বাইরে নিয়ে যাও। টাকা না থাকলে শিক্ষা নয়। আজ শিক্ষার নামে যা চলছে তা হল বাণিজ্য। শিক্ষাকে যেমন শাসকগোষ্ঠী নামিয়ে দিচ্ছে, একইসাথে অবনমন ঘটাচ্ছে আমাদের সংস্কৃতিকেও। শিক্ষার সাথে মূল্যবোধের এই অবনমনের ফলেই আমরা দেখতে পাই, দেশের সর্বোচ্চ মেধাবিদের স্থান বুয়েটে নিজের সহপাঠীদের দ্বারাই আবরার ফাহাদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। এটা পাল্টাতে হলে পাল্টা সংস্কৃতি ও পাল্টা রাজনীতি নির্মাণ করতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে আল কাদেরী জয় বলেন, আমাদের আলোচনাটা শিক্ষা নিয়ে হলেও তা কেবল শিক্ষার গণ্ডির মধ্যেই আবধ্য থাকেনি। কারণ যে সমাজ বৈষম্য তৈরি করে, যে সমাজ শুধু মুনাফার স্বার্থ দেখে, তার পক্ষে জনগণের শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব না। যে মুক্তিযুদ্ধ আজ ছাত্রসমাজের কাছে গর্বের বিষয়, গবেষণা ও পর্যালোচনার বিষয়, লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা হতে পারতো, তা আজ একটি দলীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। সর্বস্তরের জনগণের জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে আজকে চলমান শাসন-শোষণকে উচ্ছেদ করতে হবে, যেই সমাজ এই পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাকে ভেঙে নতুন সমাজ গড়তে হবে। আর সেই লড়াইয়কে বেগবান করার আহ্বান জানাই।

 

শেয়ার করুন