ডেস্ক রিপোর্ট

২ জুলাই ২০২১, ৬:৫৮ অপরাহ্ণ

‘লকডাউনে বিপর্যস্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবন ও জীবিকা নিশ্চিত করতে হবে’

আপডেট টাইম : জুলাই ২, ২০২১ ৬:৫৮ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

অধিকার ডেস্ক:: করোনাভাইরাসের উচ্চ সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকার গত ১ জুলাই হতে কঠোর বিধিনিষেধ বা লকডাউন কর্মসূচি কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া দেশের কয়েক কোটি শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবন ও জীবিকা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানিয়ে এক যুক্তবিবৃতি প্রদান করেছেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ এর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হাবিবুল্লাহ বাচ্চু ও সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী আশিকুল আলম।

বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ লকডাউনের কারণে নৌযানসহ সকল ধরণের পরিবহণ শ্রমিক, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, বেকারি, পর্যটনসংশ্লিষ্ট শ্রমিক, লোকাল গার্মেন্টস শ্রমিক, রিকশা-ঠেলা-দিনমজুর, স’মিল, চাতাল, মুদ্রণ, পাদুকা, ক্ষৌরকার, হকার, গৃহকর্মী, দোকান কর্মচারী, নির্মাণ, বারকি, দর্জি শ্রমিকসহ বিভিন্ন সেক্টরেরর অধিকাংশ শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে অনাহার-অর্ধাহারে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষতঃ দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্দ্ধগতির এই সময়ে শ্রমজীবী জনগণ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দুবেলা দুমুঠো ডাল ভাত জুটাতে পারে না, সেরকম অবস্থায় খাবার ছাড়া এই মানুষদের ঘরে থাকার কথা বলা তাদের সাথে উপহাস ছাড়া আর কি হতে পারে! গত একবছরে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন, ৬২ শতাংশ শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। সরকারের সদ্য পাসকৃত বাজেটেও এই দরিদ্র জনগণের জন্য কিছুই রাখা হয়নি, এমন কি জনগণের সামাজিক নিরাপত্তায় রেশনিং চালুর প্রেক্ষিতেও কোন বরাদ্দ হয়নি। উপরন্তু কোন রকম বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ না করেই সরকার লক্ষ লক্ষ ব্যাটারি চালিত রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইক, নসিমন, করিমন, ভটভটি উচ্ছেদ করার তৎপরতা চালাচ্ছে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, করোনাকালে সরকার রাষ্ট্রায়াত্ব পাটকল, চিনিকলসমূহ বন্ধ করে দেওয়ার এক বছরেও শ্রমিকদের পাওনাদি পরিশোধ করেনি। এরকম অবস্থায় সরকার জনগণের কোন রকম দায়দায়িত্ব গ্রহণ না করে ‘কঠোর লকডাউন’ চাপিয়ে দিয়ে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশের ভয় দেখিয়ে জনগণকে গৃহবন্দী করে রাখতে চাইছে। সরকার জনগণের জীবন ও জীবিকার দায়কে অস্বীকার করলেও সাম্রাজ্যবাদী লগ্নিপুঁজি ও দালালপুঁজির সাথে সম্পর্কিত গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্প ও প্রতিষ্ঠান ঠিকই খোলা রেখেছে। অথচ গার্মেন্টস মালিকরা কথা দিয়েও শ্রমিকদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করেনি। পরিবহণ সংকটে জীবিকার তাগিদে গার্মেন্টস শ্রমিকদের দুরদুরান্তের পথ পায়ে হেটে কাজে যোগ দিতে হচ্ছে। শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের জনগণ সাধারণত মাসের ৭/৮ তারিখের দিকে বেতন পেয়ে থাকে কিন্তু এবার মাসের শুরুতেই লকডাউন দেওয়ায় এদের অনেকেই খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। ইতোমধ্যে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে চলমান লকডাউন আরও বাড়ার সম্ভবনা রয়েছে। অথচ চলমান লকডাউনে সরকার পক্ষে ত্রাণ তৎপরতারও কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বৈশ্বিক মহামারি করোনা আজ মুনাফার হাতিয়ার আর মানুষের জীবন জীবিকা, চলাচলের স্বাধীনতা তথা সংঘবদ্ধ হওয়ার সুযোগকে আরও নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় কঠোর বিধিনিষেধ, লকডাউন বা শাটডাউনের নামে নিয়ন্ত্রণকে বিভিন্নভাবে জোরদার করা হচ্ছে। করোনা মহামারির পাশাপাশি বন্যার পদধ্বনি দেশের শ্রমিক কৃষক মেহনতি জনগণকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার জনগণকে সম্পৃক্ত করার পরিবর্তে সেনা, বিজিবি, পুলিশ দিয়ে ভয় দেখিয়ে জনগণকে ঘরে রাখতে চাইছে, তা কোনভাবেই করোনা মোকাবেলায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হতে পারে না এবং তার ফলাফলও আশানুরূপ হবে না।

নেতৃবৃন্দ সরকারের টিকাদান কর্মসূচির অব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিক-কর্মচারী ও প্রবাসীদের অগ্রাধিকার তালিকায় না রাখার সমালোচনা করেন বলেন বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৫ হাজার অফিসার ও সাধারণ নাবিক বিদেশী পতাকাবাহী সমুদ্রগামী জাহাজে চাকুরি করে দেশের মুদ্রা ভান্ডারে বৈদশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়িয়ে থাকে। বিশ্বের অনেক দেশ ঐ সকল নাবিকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়া হলেও বাংলাদেশ এব্যাপারে কোন দিকনির্দেশনা না থাকায় অদূর ভবিষ্যতে সমুদ্রগামী জাহাজে চাকুরিতে যাওয়ার সুযোগ হারাবে বাংলাদেশী নাবিকরা। এছাড়া বিভিন্ন বিদেশী কোম্পানীর শ্রমিকদের কাজের প্রয়োজনে বিদেশে যাতায়াত করতে হয়, কিন্তু টিকা গ্রহণ করতে না পারায় তাদের অনেকেই চাকুরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। যে প্রবাসীদের কষ্ঠার্জিত অর্থের বিনিময়ে সরকার রেমিটিন্স ও রিজার্ভ নিয়ে উন্নয়নের সাফাই গায়, টিকা দানে সরকারের অব্যবস্থাপনা ও অবহেলায় সেই প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়া সংকটের মুখে পড়েছে।

নেতৃবৃন্দ করোনাভাইরাস মোকাবেলায় লকডাউন কার্যকরে ঘরে ঘরে খাদ্য, নগদ অর্থ, বিনামূল্যে চিকিৎসা, নিত্যপণ্যে মূল্য কমানো ও সর্বস্তরে রেশনিং চালু, সকল উপজেলায় পিসিআর ল্যাব স্থাপন করে বিনামূল্যে পর্যাপ্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা, ন্যূনতম জেলা পর্যায় পর্যন্ত আইসিইউ বা নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ও ভেন্টিলেটরসহ সকল চিকিৎসা সুবিধার নিশ্চয়তা বিধান, লকডাউনে শ্রমজীবী ও কর্মজীবী জনগণের বেতন ও বোনাস প্রদান নিশ্চিত করা, পণ্যবাহী নৌযানসহ জরুরী পরিষেবায় নিয়োজিত শ্রমিকদের জন্য ঝুঁকি ভাতা প্রদান, জরুরী ও ঝুকিপূর্ণ পরিষেবায় নিয়োজিত শ্রমিক-কর্মচারীদের টিকাদান কর্মসূচিতে অগ্রাধিকারভূক্ত করা, করোনা পরিস্থিতিতে জনগণের নিকট হতে গ্যাস, বিদ্যুত, পানির বিল আদায় বন্ধ, এনজিওদের কিস্তি আদায় বন্ধ ও সুদ মওকুফ করার দাবি জানান। করোনা পরিস্থিতিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে শ্রমিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখে, করোনার আঘাতে আজ সেই শ্রমিক ও শ্রমজীবী জনগণের জীবন ও জীবিকা সবচেয়ে সংকটে। করোনা পরিস্থিতি শ্রমিক শ্রেণিকে আরও জীবন্তভাবে উপলব্ধিতে নিয়ে এসেছে যে প্রচলিত শোষণমূলক শাসন ব্যবস্থায় যে কোন দুর্যোগ মহামারি তৈরি হয় অধিক মুনাফালোভী শোষকগোষ্টির কৃতকর্মের ফলাফল স্বরূপ। তাই এই ধরণের ব্যবস্থা পরিবর্তনসহ সকল দুর্যোগ মোকাবেলায় শ্রমিকশ্রেণির ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের কোন বিকল্প নেই।

শেয়ার করুন