ডেস্ক রিপোর্ট
২৯ মে ২০২১, ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ
অধিকার ডেস্ক:: ‘হাদিস-কোরআনে নারীর আয় করার সুযোগ নাই’ এমন মন্তব্য করে প্রতিবন্ধী এক নারীর মুরগির খামার ব্যবসায় বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রামের পটিয়ায় উপজেলার নিলু আকতার নামে ওই নারী এ বিষয়ে থানায় মামলা করেছেন।
প্রতিবেশী আবু তৈয়ব খামার বন্ধ করে নিলুকে ভিক্ষার পরামর্শ দিয়েছেন বলে অভিযোগ তার। খামার বন্ধ না করায় নিলুসহ তার পরিবারের সদস্যদের ওপর গত ৩ এপ্রিল হামলা করেন আবু তৈয়ব ও তার অনুসারীরা, এমন অভিযোগে পটিয়া থানায় মামলা করেছেন নিলু।
জানা যায়, পটিয়া উপজেলার জিরি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড মালিয়ারা গ্রামের আলমের বাড়ির নুর মোহাম্মদের চার কন্যা। নিলু আকতারের জন্ম থেকে এক হাত নেই। নিলু ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। ১০ বছর আগে নিলুকে তাদের পার্শ্ববতী মালিয়ারা সাতভাই পাড়ার কামাল উদ্দিনের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। তাদের ঘরে তিন সন্তান। তবে বিয়ের পর থেকে বাবার বাড়িতে থাকেন নিলু। সেখানে মাকে নিয়ে বসবাস করার পাশাপাশি একটি পোলট্রি ফার্ম পরিচালনা করেন। নিলুর বাবা প্রবাসী। স্বামী দিনমজুর।
নিলু আকতার বলেন, আবু তৈয়ব আমার প্রতিবেশী। তারও পোলট্রি ফার্ম রয়েছে। লোকজন আমার কাছ থেকে মুরগি বেশি কেনে। এ জন্য তৈয়বের হিংসা হয়। সেটি তিনি মেনে নিতে পারছেন না। তাই আমাকে বলে, তুমি প্রতিবন্ধী এবং নারী। তোমার ইনকাম করার সুযোগ নাই। হাদিস-কোরআনে নারীর আয় করার সুযোগ নাই। ফতোয়া আছে। তুমি এসব বন্ধ কর। বাড়ির সুনাম নষ্ট হচ্ছে। তুমি প্রতিবন্ধী। ভিক্ষা কর। আমার কাছ থেকে থালা-বাসন নিয়ে যাও।
নিলু আরো বলেন, আমি তার উপদেশ শুনিনি। প্রতিবন্ধী হয়েও এক হাতে কাজ করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সেটি মেনে নিতে পারেননি তৈয়ব। সে প্রথমে আমাকে হুমকি ধমকি দেয়। এরপর আমি তার কথা না শোনাতে পরিকল্পিতভাবে হামলা করে।
এ ঘটনায় গত ১২ এপ্রিল পটিয়া থানায় মামলা দায়ের করেন নিলু। মামলার এজাহারে বলা হয়, প্রতিবন্ধী নিলু কৃষি ব্যাংক থেকে ৩ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বাবার দেওয়া জায়গায় একটি পোলট্রি ফার্ম দেয়। ফার্ম দেওয়ার পর থেকে প্রতিবেশী আবু তৈয়বের রোষানলের শিকার হন। আবু তৈয়বের পোলট্রি ও ডেইরি ফার্ম থাকায় নিলুকে ফার্ম বন্ধের জন্য তৈয়ব চাপ দেন। ফার্ম চালিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার প্রচেষ্টায় নিলু ফার্ম বন্ধ করেনি। এতে তৈয়ব নিলুকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করতে থাকে। নিলুর সাত বছরের মেয়েকে অপহরণ করলে পুলিশ উদ্ধার করে এবং এই ব্যাপারে মামলা হয়। এর জের ধরে তাদের কয়েকবার হত্যার চেষ্টা চালায়। এ অবস্থায় গত ৩ এপ্রিল আবু তৈয়বসহ কয়েকজন নিলুর বাবার বাড়িতে ঢুকে কিরিচ দিয়ে নিলু ও তার মাকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে। স্থানীয় লোকজন তাদের উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করে।
নিলু আক্তার বলেন, আমি মামলা করায় আবু তৈয়ব পুলিশের সহযোগিতায় আমার বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেছে। আমার ওপর হামলাকারীরা এলাকায় বীরদর্পে ঘুরলেও পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করছে না।
এদিকে আবু তৈয়ব পাল্টা মামলায় এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, নিলুর বাবার সঙ্গে আবু তৈয়বের পারিবারিক কিছু জায়গা নিয়ে বিরোধ রয়েছে। একটি সীমানা প্রাচীর নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিন। সেটিকে কেন্দ্র করে গত ৩ এপ্রিল নিলু ও তার পরিবারের সদস্যরা আবু তৈয়বের পরিবারের ওপর হামলা করে। এতে করে আবু তৈয়বের স্ত্রী নাজমা পারভীন আহত হন। প্রথমে তাকে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এরপর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে আবু তৈয়ব বলেন, ‘ওই মেয়ের সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ নাই। ধর্ম নিয়ে আমি কিছু বলিনি। তাদের সঙ্গে জায়গা-জমি নিয়ে বিরোধ আছে। সেটি থেকে মাঝেমধ্যে ঝগড়া হয়। কিন্তু নিলু তার প্রতিবন্ধী হওয়া বিষয়টি কাজে লাগিয়ে আমার নামে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’।
পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল করিম মজুমদার বলেন, নিলুর দায়েরকৃত মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিল এসআই আক্কাস। তিনি পটিয়া থানা থেকে বদলি হয়ে গেছেন। নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হবে।
মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ওসি বলেন, কাউন্টার মামলা আছে। দু’পক্ষই মামলা করেছে। তাই বিষয়টি জটিল হয়ে গেছে। আমরা মামলার তদন্ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।
ওসি রেজাউল করিম মজুমদার আরো জানান, বৃহস্পতিবার রাতে নিলু আকতারের দায়ের করা মামলার ২ নম্বর আসামি শাহ আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।