ডেস্ক রিপোর্ট

১০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

ক্ষমতার পালাবদল, চরিত্রের পরিবর্তন—জনগণের প্রত্যাশা কোথায় হারিয়ে যায়?

আপডেট টাইম : এপ্রিল ১০, ২০২৬ ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

শেয়ার করুন

আবু নাসের অনীক :

ক্ষমতার স্বরূপ ও মানুষের পরিবর্তন
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি চিরন্তন সত্য হলো—ক্ষমতা মানুষকে শুধু প্রভাবিতই করে না, বরং অনেক সময় তাকে বদলে দেয়।
যে মানুষ একসময় নিপীড়িত ছিল, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছিল, জনতার কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছিল—ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠেই সেই মানুষটিই কখনো কখনো হয়ে ওঠে নির্লিপ্ত, দূরবর্তী, এমনকি কখনো কখনো অত্যাচারীর প্রতিচ্ছবি।
আমাদের সমাজ-রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় এই চিত্রটি যেন আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।

নিপীড়ন থেকে ক্ষমতায়—দায়বোধের ক্ষয়
একসময় যারা বছরের পর বছর নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, যাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ছিল ঝুঁকির মধ্যে, যারা আশ্রয় নিয়েছেন সহানুভূতিশীল মানুষের কাছে—তারা আজ রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে।
অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই সংকটকালীন সময়ের সহযোদ্ধা, আশ্রয়দাতা, কিংবা সাধারণ জনগণের প্রতি তাদের দায়বোধ যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্নটা তাই খুব স্বাভাবিক—এই পরিবর্তনটা কেন?
এবং এই পরিবর্তন কি শুধু ব্যক্তিগত, নাকি কাঠামোগত?

ক্ষমতার মানসিকতা ও বিচ্ছিন্নতার বৃত্ত
প্রথমেই আমাদের বুঝতে হবে,ক্ষমতা কেবল একটি প্রশাসনিক অবস্থান নয়; এটি একটি মানসিক অবস্থাও তৈরি করে।
ক্ষমতায় যাওয়ার পর একজন রাজনীতিকের চারপাশে তৈরি হয় এক ধরনের “বাবল” বা বিচ্ছিন্নতা।
সেখানে বাস্তবতার চেয়ে বেশি প্রাধান্য পায় সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর মতামত, চাটুকারদের প্রশংসা, এবং প্রশাসনিক ব্যস্ততার অজুহাত।
ফলে ধীরে ধীরে জনগণের সঙ্গে তার সরাসরি সংযোগ কমে যায়। যে মানুষ একসময় জনতার ভিড়ে মিশে যেত, আজ সে নিরাপত্তার বলয়ে বন্দি।
স্বার্থান্বেষী চক্রের প্রভাব
এই বিচ্ছিন্নতার সুযোগ নেয় একটি শক্তিশালী স্বার্থান্বেষী চক্র। এই চক্রের মূল লক্ষ্য থাকে ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করা।
তারা ধীরে ধীরে একজন নেতাকে এমনভাবে ঘিরে ফেলে যে, তিনি বাস্তবতার সঠিক প্রতিফলন আর দেখতে পান না।
ফলে জনগণের সমস্যা, জনস্বার্থের প্রশ্ন—সবকিছুই তার কাছে গৌণ হয়ে যায়।

“ব্যস্ততা” নাকি অজুহাত?
এখানেই আসে “ব্যস্ততা”র প্রশ্ন। জনস্বার্থের কথা শোনার জন্য সময় নেই—এটা কি সত্যিই ব্যস্ততার কারণ, নাকি একটি অজুহাত?
একজন জনপ্রতিনিধির প্রধান দায়িত্বই তো জনগণের কথা শোনা, তাদের সমস্যা বোঝা এবং সমাধানের পথ খোঁজা। যদি এই মৌলিক কাজটির জন্যই সময় না থাকে, তাহলে সেই ব্যস্ততা কিসের?

ক্ষমতার ভোগ ও লুটপাটের বাস্তবতা
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়,এই তথাকথিত ব্যস্ততা আসলে ক্ষমতার ভোগ-বিলাস, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, এবং অর্থনৈতিক সুযোগের ব্যবস্থাপনায় ব্যয়িত হয়।
রাষ্ট্রীয় সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ, প্রকল্প বণ্টন, নিয়োগে প্রভাব—এইসব বিষয় হয়ে ওঠে অগ্রাধিকার। ফলে “লুটপাট” শব্দটি শুধু একটি আবেগপ্রবণ অভিযোগ নয়; এটি অনেক সময় বাস্তবতার প্রতিফলনও হয়ে দাঁড়ায়।

কাঠামোগত সংকটের শিকড়
তবে সমস্যাটা কেবল ব্যক্তির নয়; এটি একটি কাঠামোগত সংকটও। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জবাবদিহিতার অভাব, দলীয়করণ, এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ—এই তিনটি বিষয় মিলেই তৈরি করে এমন এক পরিবেশ যেখানে একজন নেতা খুব সহজেই জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন।
যখন কোনো ব্যবস্থায় কার্যকর বিরোধী কণ্ঠ থাকে না, যখন গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে প্রশ্ন তুলতে পারে না, যখন নাগরিক সমাজ দুর্বল হয়ে পড়ে—তখন ক্ষমতাসীনদের মধ্যে দায়বোধ কমে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

রাজনৈতিক স্মৃতিভ্রংশতা
এই পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্মৃতিভ্রংশতা—রাজনৈতিক স্মৃতিভ্রংশতা।
যারা একসময় নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তারা অনেক সময় ক্ষমতায় গিয়ে সেই অতীত ভুলে যান।
অথচ সেই অতীতই তাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়ার কথা ছিল। তারা ভুলে যান যে, আজ যে জনগণ তাদের ক্ষমতায় এনেছে, কাল সেই জনগণই তাদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে পারে।

প্রতিশোধপরায়ণ মনস্তত্ত্ব ও ক্ষমতার অপব্যবহার
এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক দিকও কাজ করে। দীর্ঘদিন বঞ্চিত থাকার পর হঠাৎ ক্ষমতা পাওয়া গেলে অনেকের মধ্যে একটি প্রতিশোধপরায়ণ মানসিকতা তৈরি হয়।
তারা মনে করেন,এতদিন তারা বঞ্চিত ছিলেন, এখন তাদের “ভোগ” করার সময়। এই মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, এবং ক্ষমতার অপব্যবহার।

জনগণের আস্থা সংকট
কিন্তু এর সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয় রাষ্ট্রের এবং সমাজের। যখন জনগণের প্রতিনিধিরা জনগণের কথা শোনেন না, তখন জনগণের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।
এই হতাশা ধীরে ধীরে রূপ নেয় অবিশ্বাসে, এবং সেই অবিশ্বাস গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
মানুষ যখন বিশ্বাস হারায়, তখন তারা বিকল্প খোঁজে—কখনো সেটা হয় চরমপন্থা, কখনো হয় উদাসীনতা।

পরিবর্তনের প্রশ্ন
এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—পরিবর্তনটা তাহলে কোথায়? যদি ক্ষমতার পালাবদলই কেবল ঘটে, কিন্তু চরিত্রের কোনো পরিবর্তন না আসে, তাহলে সেই পরিবর্তন কি আদৌ কোনো অর্থ বহন করে?
জনগণ কি শুধু নতুন মুখ দেখতে চায়, নাকি নতুন রাজনীতি?

জবাবদিহিতা: পরিবর্তনের প্রথম শর্ত
একটি সত্যিকারের পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। এর জন্য প্রথমেই প্রয়োজন জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
জনপ্রতিনিধিদের নিয়মিতভাবে জনগণের মুখোমুখি হতে হবে, তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। শুধু নির্বাচনের সময় নয়, বরং পুরো মেয়াদজুড়েই এই জবাবদিহিতা বজায় রাখতে হবে।

দলীয় গণতন্ত্রের গুরুত্ব
দ্বিতীয়ত, দলীয় কাঠামোর ভেতরেও গণতন্ত্র চর্চা করতে হবে। যদি একটি দলের ভেতরেই মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকে, তাহলে সেই দল থেকে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব আশা করা কঠিন।
নেতাদের চারপাশে চাটুকারদের পরিবর্তে সমালোচনামূলক কণ্ঠ থাকা জরুরি।

নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা
তৃতীয়ত, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তারা যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে ক্ষমতার অপব্যবহার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
জনগণের সচেতনতা বাড়ানোও এখানে একটি বড় বিষয়। সচেতন নাগরিকই পারে তার অধিকার দাবি করতে এবং তার প্রতিনিধিকে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখতে।

নৈতিকতা: রাজনীতির প্রাণ
সবশেষে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো নৈতিকতা। রাজনীতি যদি কেবল ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যম হয়ে যায়, তাহলে সেখানে নৈতিকতার জায়গা থাকে না।
কিন্তু রাজনীতি যদি জনসেবার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সেই রাজনীতিতে নৈতিকতা, দায়বদ্ধতা এবং মানবিকতা—এই তিনটি বিষয় স্বাভাবিকভাবেই জায়গা করে নেয়।

প্রতিনিধিত্বের সংকট
আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তাই প্রশ্নটা খুব স্পষ্ট—যারা জনগণের কথা শোনার সময় পান না, তারা আসলে কাদের প্রতিনিধি? এবং তারা কী ধরনের পরিবর্তন আনতে চান?

নাগরিকের ভূমিকা ও দায়
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়াটা শুধু রাজনীতিবিদদের জন্য নয়, বরং আমাদের সবার জন্য জরুরি। কারণ রাষ্ট্র কেবল কিছু মানুষের নয়; এটি আমাদের সবার।
আর এই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে আমরা কতটা সচেতন, কতটা প্রশ্ন করতে পারি, এবং কতটা আমাদের অধিকার নিয়ে দাঁড়াতে পারি তার উপর।

পরিবর্তনের প্রকৃত অর্থ
পরিবর্তন কখনো শুধু ক্ষমতার পালাবদলে আসে না; পরিবর্তন আসে চিন্তার পালাবদলে, চর্চার পালাবদলে, এবং সবচেয়ে বেশি আসে দায়বোধের পুনর্জাগরণে।
সেই দায়বোধ ফিরে আসুক—এই প্রত্যাশাই আজকের সবচেয়ে বড় আশা।

সংকটের গভীরতর স্তর
প্রাতিষ্ঠানিক বিকৃতি (Institutional Distortion)
উপরের আলোচনাটি মূলত একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক বিচ্যুতির ছবি তুলে ধরে। কিন্তু বিষয়টির শিকড় আরও গভীরে।
রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো যখন দলীয় প্রভাবের অধীনে চলে যায়, তখন ব্যক্তি যতই সৎ হোক না কেন, সে কাঠামোর ভেতরে থেকে কার্যকরভাবে জনগণের পক্ষে কাজ করতে পারে না।
ফলে ব্যক্তি নয়, কাঠামোই ধীরে ধীরে তাকে নিজের মতো করে গড়ে নেয়।

রাজনৈতিক অর্থনীতি ও রেন্ট-সিকিং
ক্ষমতা শুধু নীতিনির্ধারণের জায়গা নয়; এটি সম্পদ বণ্টনেরও কেন্দ্র। যে দল বা গোষ্ঠী ক্ষমতায় আসে, তারা এই সম্পদ বণ্টনের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
ফলে রাজনীতি হয়ে ওঠে এক ধরনের “রেন্ট-সিকিং” প্রক্রিয়া, যেখানে জনস্বার্থ নয়, বরং ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত লাভই হয়ে ওঠে মুখ্য।

সামাজিক মনস্তত্ত্ব ও আনুগত্যের সংস্কৃতি
আমাদের সমাজে “ক্ষমতাবানদের প্রতি আনুগত্য” একটি প্রচলিত সংস্কৃতি। ফলে যখন কেউ ক্ষমতায় আসে, তখন তাকে প্রশ্ন করার বদলে অনেকেই তার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে চায়।
এই প্রবণতা ক্ষমতাসীনদের আরও বেশি অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলে।

ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রভাব
আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজে সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে ভোগ, সম্পদ, এবং দৃশ্যমান ক্ষমতা। ফলে রাজনীতিতেও এই মানসিকতা প্রবেশ করেছে।
ক্ষমতায় যাওয়া মানেই যেন ব্যক্তিগত উন্নতি, বিলাসিতা, এবং সামাজিক প্রভাব বৃদ্ধি—এই ধারণা অনেকের মধ্যে কাজ করে।

রাজনৈতিক শিক্ষার অভাব
গণতন্ত্র শুধু একটি ব্যবস্থার নাম নয়; এটি একটি চর্চা। যদি রাজনৈতিক কর্মীরা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে প্রশিক্ষিত না হন, তাহলে তারা ক্ষমতায় গিয়ে সেই মূল্যবোধ ধারণ করতে পারবেন না।

সমাধানের বহুমাত্রিকতা
এই বিশ্লেষণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—সমস্যাটি কেবল “খারাপ মানুষ” বা “খারাপ নেতা”র নয়। বরং এটি একটি জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল, যেখানে ব্যক্তি, কাঠামো, সংস্কৃতি, এবং অর্থনীতি—সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে জড়িত। তাই সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক।
ক্ষমতার প্রকৃত পরীক্ষা
সবশেষে বলা যায়, ক্ষমতার প্রকৃত পরীক্ষা হয় ক্ষমতায় যাওয়ার পর।
যারা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেন, তারাই ইতিহাসে জায়গা করে নেন। আর যারা ব্যর্থ হন, তারা শুধু আরেকটি হতাশার নাম হয়ে থেকে যান।

লেখক: উন্নয়ন কর্মী

শেয়ার করুন