ডেস্ক রিপোর্ট
১২ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:০০ অপরাহ্ণ
অধিকার ডেস্ক: নারীমুক্তি আন্দোলনের পথিকৃৎ মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়ার ১৪৫তম জন্ম ও ৯৩ তম মৃত্যুবার্ষিকী গত ৯ ডিসেম্বর’২৫ ছিল । সমাজে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, সমানাধিকারসহ সামগ্রিকভাবে নারীমুক্তির লড়াইয়ে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। শুধু নারীদের নয় সমগ্র সমাজের অগ্রগতির জন্য তিনি কাজ করেছেন। সে কারণে সকল পশ্চাদপদ, প্রতিক্রিয়াশীল এবং সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কাছে আজও তিনি হুমকিস্বরূপ।
এই মহিয়সী নারীর জন্ম ও মৃত্যু দিবস স্মরণে সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম এর উদ্যোগে আজ ১২ ডিসেম্বর ২০২৫, বিকাল ৩.০০ টায় শাহবাগে নারী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম ঢাকা নগর শাখার সভাপতি সেলিনা ইয়াসমিন কনা। সমাবেশে আলোচনা করেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ এর সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য ও জোন ৬ এর ইনচার্জ কমরেড নিখিল দাস, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রকৌশলী শম্পা বসু, সাংগঠনিক সম্পাদক ডাঃ মনীষা চক্রবর্ত্তী। সমাবেশ পরিচালনা করেন সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম ঢাকা নগর শাখার সাধারণ সম্পাদক রুখশানা আফরোজ আশা।
কমরেড নিখিল দাস বলেন, ‘বেগম রোকেয়া ছিলেন নারী জাগরণের অগ্রদূত; তিনি বাংলার রেঁনেসা আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। সমাজ সংস্কারের পথে তিনি নারী জাগরণকে প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। নারীমুক্তির সংগ্রামে তিনি নারী শিক্ষাকে হাতিয়ার করেছিলেন। তাঁর সংগ্রামী জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায় সারাজীবন তিনি সমাজের কল্যাণ কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। কিন্তু তৎকলীন সমাজে বিরাজমান কূপমন্ডুক চিন্তার আঘাত জর্জরিত হয়েছেন প্রতিনিয়ত। তাই তিনি বলেছেন, “যদি সমাজের কাজ করিতে চাও, তবে গায়ের চামড়াকে এতখানি পুরু করিয়া লইতে হইবে যেন নিন্দা-গ্লানি, উপেক্ষা-অপমান, কিছুতেই তাহাকে আঘাত করিতে না পারে।” জীবদ্দশায় তো বটেই মৃত্যুর ৯৩ বছর পরেও তার উপর আক্রমণ শেষ হয়নি। গণঅভ্যুত্থানের পরে মানুষের বিপুল প্রত্যাশার বিপরীতে চলা দেশে বেগম রোকেয়া শুরুতেই আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। বিগত ১৫ মাসে সেই আক্রমণ আরো তীব্র হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাঁর ছবিতে কালি লেপন দিয়ে শুরু হয়েছিল, আর এবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তাঁকে মুরতাদ ঘোষণা করছে। এসব ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নীরবতা ও প্রশ্রয়ে নারী বিদ্বেষী কূপমন্ডুক ও উগ্র মনোভাবের বিস্তার ঘটছে।’
সভায় প্রকৌশলী শম্পা বসু বলেন, ‘সমাজে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, সমঅধিকারসহ সামগ্রিকভাবে নারী মুক্তির লড়াইয়ে বেগম রোকেয়া অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর মৃত্যুর ৯৩ বছর পর এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হওয়ার পরও এদেশের নারীরা আইনগতভাবেই বৈষম্যের শিকার হয়ে আছেন। সম্পত্তির উত্তরাধিকারে সম-অধিকারসহ বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ ও সন্তানের অভিভাবকত্বের প্রশ্নে এখনও নারী আইনগতভাবেই বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। সমকাজে সমমজুরি আইনে থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেই। ঘরে, বাইরে, গণপরিবহণে, কর্মক্ষেত্রে নারী নির্যাতন ও নারীর প্রতি বিদ্বেষমূলকআক্রমণ বেড়ে চলেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে নারীর শ্রমঘন্টা কমিয়ে দেওয়া, নারী ঘরে সময় দিলে সম্মানিত করার মতো মিষ্টি কথার আড়ালে নারীকে ঘরবন্দি করে রাখার পাঁয়তারা চলছে।
নারীর মতামত ছাড়া নারীকে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। নারী সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনা নিয়ে নারীর প্রতি তীব্র অপমানজনক ঘটনা ঘটেছে। সংরক্ষিত নারী আসন বৃদ্ধি ও সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাব কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে ঐকমত্য কমিশনে। বেগম রোকেয়ার মৃত্যুর এত বছর পরও, বিশেষ করে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন। নারীমুক্তি আন্দোলনে তাঁর জীবন সংগ্রাম সর্বদাই অনুপ্রেরণাদায়ক।’
সমাবেশে ডা: মনীষা চক্রবর্ত্তী বলেন, বেগম রোকেয়া যে সময় জন্মগ্রহণ করেছিলেন সে সময় সমাজ ব্যবস্থা অশিক্ষার অভিশাপ ও পুরুষতন্ত্রের অবরোধ প্রথার মধ্যে ডুবে ছিল। সে সময় মেয়েদের লেখাপড়া ছিল সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ ও পাপতুল্য। । কিন্তু তার উদ্দেশ্য ছিল সার্বিকভাবে সমাজের অগ্রগতি। কারণ তিনি বুঝেছিলেন অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীকে পেছনে ফেলে রেখে সমাজের অগ্রগতি সম্ভব নয়। তার সেই লড়াই আজও আমাদের প্রেরণা যোগায়। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও বাংলাদেশের আইনেই নারীর প্রতি বৈষম্য রাখা হয়েছে। পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিনিয়ত সেই বৈষম্যমূলক আচরণ নারীদের অগ্রযাত্রাকে ব্যহত করছে। নারীর এসকল সংকটের মূলে রয়েছে পুরুষতান্ত্রিকতা ও পুঁজিবাদী শোষণমূলক ব্যবস্থা। সমাজের সকল বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, শোষণমূলক সমাজ ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা পরিবর্তনে বেগম রোকেয়া আজও প্রেরণার উৎস। নারী পুরুষের মিলিত সংগ্রামে সাম্য সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে বেগম রোকেয়ার জীবন সংগ্রাম আজও পাথেয়।’