ডেস্ক রিপোর্ট

২৬ এপ্রিল ২০২৪, ১১:১৩ অপরাহ্ণ

ছাত্র ইউনিয়নের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সেমিনার

আপডেট টাইম : এপ্রিল ২৬, ২০২৪ ১১:১৩ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

অধিকার ডেস্ক: শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় ও প্রগতির লড়াইয়ের অগ্রণী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে “Education in the Labyrinth of Neo Liberalism: Finding a way out of the crisis” (নব্য উদারবাদের গোলকধাঁধায় শিক্ষা: সঙ্কট থেকে উত্তরণের পথ) শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেমিনারটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে ২৬ এপ্রিল বেলা সাড়ে ১১টায় শুরু হয়ে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চলে। ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নকে ২০টি দেশের ৩৪টি ছাত্র-যুব সংগঠন শুভেচ্ছা জানিয়েছে এবং ১২টি ছাত্র সংগঠন সেমিনারে বক্তব্য প্রদান করেছে।

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল রনি। তাঁর বক্তব্যে তিনি সেমিনারে আগত সকল দেশি-বিদেশী অতিথি, শ্রোতা, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিকদের শুভেচ্ছা জানান এবং নব্য উদারবাদের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ছাত্র-ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানান। সেমিনারে কী-নোট স্পিকার হিসেবে বক্তব্য রাখেন ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইকোনমিক স্টাডিজ এন্ড প্ল্যানিংয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক ড. প্রভাত পাটনায়েক। তাঁর বক্তব্যে তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উপনিবেশীকরণের প্রক্রিয়া শুরু হলেও ঔপনিবেশিক আগাসন এখনও ভিন্নরূপে চালু আছে। আমাদের মনন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের উপর ঔপনিবেশিক ধারার প্রভাব এখনও বিদ্যমান। এর মূল কারণ পশ্চিমের অনুকরণে প্রণীত শিক্ষানীতি। ব্রিটিশ আমলে বৃহত্তর বাংলায় যেভাবে শোষণ হয়েছে সেটার ব্যপকতা বিশাল। ব্রিটিশরা বাংলার এক-তৃতীয়াংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে যেত। অথচ যুক্তরাজ্যের বইগুলোতে এসবের কোন উল্লেখ নেই। এখন আমাদের কারিকুলামে যদি এগুলা না থাকে তাহলে আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা জানবেই না, এখানে কী হয়েছে অতীতে।

শিক্ষাব্যবস্থা সম্বন্ধে তিনি বলেন, আমাদের এখানকার শিক্ষাব্যবস্থা পশ্চিমাদের মত করে তৈরি করার কারণে শিক্ষার্থীদেরকে অনেক টাকা ব্যয় করতে হয়। অনেকটা “টাকা আছে যার শিক্ষা তার” নীতিতে চলছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা ভাবছে আমি টাকা দিচ্ছি তাই শিক্ষা পাচ্ছি। এটিকে তারা বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করছে। এতে শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি ব্যক্তিস্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। নয়া উদারনীতিবাদের কারণে ভারতে আজকে পড়াশোনা করার জন্য শিক্ষার্থীরা ঋণ নিচ্ছে। পরবর্তীতে যখন সে এই ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না তখন সে আত্মহত্যা করছে। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের ফলে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী দেশের কাজে না এসে কাজে লাগছে বহুজাগতিক প্রতিষ্ঠানের। বর্তমান প্রাইভেট শিক্ষা বহুজাগতিক কোম্পানী অথবা সরকারের চাকর ব্যতিত বিশেষ কিছু তৈরি করতে পারছে না। পণ্যের মোড়কে শিক্ষা শিক্ষার্থীদেরকে করে তুলছে আত্মকেন্দ্রিক। এ ধরণের শিক্ষা ‘স্টুডেন্ট লোন’ নামে অদ্ভূত এক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে, যা ঋণের দায়ে জর্জরিত কৃষকদের আত্মহত্যার কথা মনে করিয়ে দেয়।

তিনি আরো বলেন, মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাহলেই আমরা এমন একটি শিক্ষানীতি নিশ্চিত করতে পারব, যাতে করে ভবিষ্যতে আমাদের শিক্ষার্থীরা তাদের দেশের কথা জানতে পারবে, দেশকে এগিয়ে নিতে কাজ করতে পারবে। বক্তব্য শেষ করার আগে অধ্যাপক প্রভাত পাটনায়েক বলেন, নব্য উদারবাদী শিক্ষানীতি সাধারণ মানুষের কথা বলবে এমন অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল তৈরি করার বদলে বহুজাতিক ও আন্তর্জাতিক পুঁজির বুদ্ধিজীবী তৈরি করছে।

গাঁজায় চলমান গণহত্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ফিলিস্তিনে চলমান গণহত্যা নব্য উদারবাদের ফল। বিশ্বব্যাপী কর্তৃত্ববাদীরা ফিলিস্তিনিদের বিপ্লবী সত্ত্বার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে।

সেমিনারে অংশ নিয়ে জেনারেল প্যালেস্টেনিয়ান স্টুডেন্টস ইউনিয়নের মুখপাত্র ইসহাক নমুরা বলেন, ফিলিস্তিনে টানা ২০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে গণহত্যা চলছে। পৃথিবী আমাদের জনগণের উপর এর চেয়ে বেশি বর্বর আগে কখনো হয়নি। একদিকে জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতি বনাম ভেটোর খেলা চলে আর অন্যদিকে এই জাতিসংঘই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমন করে রেখেছে, যেন শিক্ষার্থীরা ৯টা-৫টা অফিস করা ছাড়া আর কোনো কাজই না করতে পারে।

অল নেপাল ন্যাশনাল ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (রেভ্যুলেশনারি)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট মদন ভুলের মতে দুর্নীতি ও বৈষম্য দূর করতে হলে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ রুখতে হবে। অল নেপাল ন্যাশনাল ফ্রি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের ভাইস জেনারেল সেক্রেটারি মিলন রাই বলেন, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমাজতন্ত্র কায়েম করতে হবে এবং সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের জন্য শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের সমন্বয়ক অঙ্কন চাকমা তাঁর বক্তব্যে বলেন, আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার অধিকার এখনো এই রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে প্রণীত শিক্ষানীতির একটিও নব্য উদারবাদের প্রভাবমুক্ত নয় এবং আদিবাসীসহ অধিকারবঞ্চিত মানুষের কথা মাথায় রেখে প্রণয়ন করা হয়নি। নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (ইউনিফাইড সোশ্যালিস্ট)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির স্কুল বিভাগের প্রধান ড. হিরেন্দ্র বাহাদুর শাহী সেমিনারে তাঁর বক্তব্যে বলেন, ভারত, বাংলাদেশ ও নেপালে শিক্ষাব্যবস্থায় নব্য উদারবাদের প্রভাব ব্যাপক। এর ফলে শিক্ষার্থীরা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা থেকে বিরত থাকছে। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের ফলে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যাপ্ত বরাদ্দ পাচ্ছে না এবং বৈষম্য বাড়ছে।

সেমিনারে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষে প্রবন্ধ পাঠ করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল রনি। শিক্ষার ধারণা, বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাপী শিক্ষাক্ষেত্রে নব্য উদারবাদের প্রভাব এবং নব্য উদারবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সম্ভাব্য কৌশলসহ বিভিন্ন দিক উঠে আসে এই প্রবন্ধে। ছাত্র ইউনিয়ন মনে করে, ক্রিটিক্যাল টিচিংকে নব্য উদারবাদের বিরুদ্ধে কাউন্টার-হেজেমনি হিসেবে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে নব্য উদারবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা সম্ভব। পাশাপাশি ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক চর্চার পুনর্জাগরণ ঘটাতে এই কৌশল কাজে লাগতে পারে। ছাত্র ইউনিয়নের মতে, ইতালির মার্ক্সিস্ট দার্শনিক এন্তোনিও গ্রামসীর কাউন্টার হেজেমনিক এডুকেশন শিক্ষাক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনে সহায়ক হতে পারে। সর্বোপরি একটি আঞ্চলিক ও বৃহত্তর বৈশ্বিক ছাত্র ঐক্য গড়ার মাধ্যমে নব্য উদারবাদের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখার আহ্বান জানায় ছাত্র ইউনিয়ন। একমাত্র যুথবদ্ধ বৈশ্বিক আন্দোলনের মাধ্যমেই নব্য উদারবাদ নামক এই বৈশ্বিক সঙ্কটের সমাধান নিশ্চিত করা সম্ভব। এই ছাত্র ঐক্যকে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সরকারকে বাধ্য করতে হবে একই ধারার শিক্ষানীতি প্রণয়ন, পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষকদের জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করবে।

সেমিনারের সমাপনী বক্তব্যে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি রাগীব নাঈম বলেন, নব্য উদারবাদী নীতির প্রভাবে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও অন্যান্য মুনাফালোভী প্রতিষ্ঠানের কাছে নতি স্বীকার করে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার শিক্ষাসহ অন্যান্য খাতে ক্রমাগত বরাদ্দ ও ভর্তুকি কমাচ্ছে। বিশ্বের অন্য অনেক দেশেও একই পরিস্থিতি বিদ্যমান। এই বৈশ্বিক সঙ্কট মোকাবেলা করতে অচিরেই আমরা বৃহত্তর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ছাত্রঐক্যের ডাক দিব। আদর্শিক ছাত্র আন্দোলনের সম্মিলিত প্রতিরোধই কেবল পারে নব্য উদারবাদকে রুখে দিতে।

সেমিনারের শেষ পর্যায়ে সেমিনারে আগত বিদেশী অতিথিদের সম্মাননা স্মারক ও উপহার হিসেবে ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন সময়ের প্রকাশনা প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য সেমিনারে পাকিস্তান, মায়ানমার, ভারত, সুইডেন, আয়ারল্যান্ড, সাইপ্রাস, রাশিয়াসহ বেশ কিছু দেশের ছাত্রনেতৃবৃন্দ ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ও অনলাইনে যুক্ত হয়ে তাদের বক্তব্য প্রদান করেন।

শেয়ার করুন