ডেস্ক রিপোর্ট
৩ ডিসেম্বর ২০২৩, ১১:৪৭ অপরাহ্ণ
রাজেকুজ্জামান রতন:
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ দিনে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ৩০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের ৩০০ আসনে ২৭৪১ জন প্রার্থী হয়েছেন। সংখ্যাটা বিপুল। প্রার্থীদের অনেকেই নির্বাচনী আচরণবিধির তোয়াক্কা না করে শোডাউনের নামে শক্তি প্রদর্শন করেছেন। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে সদ্য নিবন্ধিত দল যেমন আছে, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন দলও আছে। বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না থাকলে এই নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক বলে স্বীকৃতি দিতে পারেন যে কেউ। কিন্তু যারা রাজনীতির খোঁজখবর রাখেন তারা বলবেন, সংখ্যা বিপুল হলেও নির্বাচন শেষ পর্যন্ত অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে না।
রাজনীতির সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক থাকবেই। নির্বাচন ক্ষমতায় যাওয়ার একটা উপায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ক্ষমতা কাকে ক্ষমতাবান করবে? বিবেচনা করতে হবে কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গেলে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার, সম্পদের ওপর মালিকানা এবং নিরাপত্তা বাড়বে? নাকি ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর দুর্নীতি, সম্পদ বৃদ্ধি, প্রতিপক্ষকে দমনপীড়ন করার ক্ষমতা বাড়বে এবং জবাবদিহিতার মাত্রা কমবে? যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গেলে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পদ বাড়তে থাকে এবং ব্যাপক জনগণের সঙ্গে বৈষম্য ও দূরত্ব বাড়তে থাকে তখন সে দলের নাম যাই হোক না কেন এবং ঐতিহ্য যত বর্ণাঢ্য হোক না কেন, তারা জনগণের পক্ষের রাজনৈতিক দল হতে পারে না। তখন জনগণের কর্তব্য কী? নিজেদের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের পরাস্ত করা বা ভোটের মাধ্যমে পরাজিত করা। এটা করতে না পারলে লুটপাট, দুর্নীতি বাড়বে, যেভাবেই হোক ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রবণতা বাড়বে। বাংলাদেশের জনগণ এখন এটাই প্রত্যক্ষ করছেন আর প্রতীক্ষায় আছেন একটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতার পরিবর্তনের।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনের নানা মডেল ও চর্চা আছে। এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের চর্চায় হয়তো মিলবে না। তবে একটা কথা সবাই বলে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হবে এমন একটা পদ্ধতি, যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে। জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর ক্ষেত্রে নির্বাচন একটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতির অন্যতম যে গণতন্ত্রের কথা সমস্বরে এবং উচ্চৈঃস্বরে ক্ষমতাসীনরা বলে থাকেন, তারা ক্ষমতায় ছিলেন কিন্তু গত ৫২ বছরে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের গ্রহণযোগ্য এবং স্থায়ী পদ্ধতি তৈরি করেননি। তাই পাঁচ বছর পরপর নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে উঠে আর উত্তেজনা উঠে চরমে। জীবন ও সম্পদ নষ্ট হয়, সংঘাত-সংঘর্ষের রেশ থাকে বহুদিন। আর সমাধান ও শান্তি চলে যায় বহু দূরে।
নির্বাচন এবং গণতন্ত্রের চর্চা যেভাবে চলছে তা হিসাব করলে দেখা যায়, গত ৫২ বছরের মধ্যে বিএনপি তিন দফায় ক্ষমতায় ছিল ১৬ বছর ৯ মাস, জাতীয় পার্টি ৮ বছর ৮ মাস। বাকি সময়টা আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় ছিল এবং আছে। স্বাধীনতার পর প্রায় পৌনে চার বছর ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনার সরকার চার দফায় প্রায় ২০ বছর। ফলে দেশের গণতন্ত্রায়নের দুর্বলতার ক্ষেত্রে এই তিন দলের দায়িত্ব তারা অস্বীকার করতে পারে না। দলীয় গঠনতন্ত্র ও সংবিধানে যা লেখা আছে তা হয়তো অনেকেই পড়েননি, কিন্তু অর্থনৈতিক নীতি ও রাজনৈতিক চরিত্র বিচারে তিন প্রধান দলের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য কি দৃশ্যমান হয়? দেখা যাচ্ছে, সবার উদ্দেশ্য অর্থনৈতিক দিক থেকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিকভাবে যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকা এবং ক্ষমতায় যাওয়া। কেউ অসাম্প্রদায়িকতা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলতে বলতে রাষ্ট্রধর্ম বহাল রাখে, হেফাজতকে মিত্র করে নেয়। আবার কেউ নিজেদের মুক্তিযোদ্ধার দল দাবি করেও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে। ফলে জনমানুষের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয়েছে, ক্ষমতার জন্য সব করতে পারে রাজনৈতিক দলগুলো।
দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে ফলাফল কী হয় তা সাতটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেখা গেছে। ১৯৭৩ সালে ২৯৩ আসন, ১৯৭৯ সালে ২০৭ আসন, ১৯৮৬ সালে ১৫৩টি আসন, ১৯৮৮ সালে ২৫১ আসন, ১৯৯৬ সালে ২৮৯ আসন, ২০১৪ সালে ২৩৪ আসন এবং ২০১৮ সালে ২৫৮ আসনে জয়লাভ করে ক্ষমতাসীন দলগুলো দেখিয়ে দিয়েছে যে, ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করলে বিজয় সুনিশ্চিত। এমনকি সংবিধান সংশোধন করার মতো আসন হাতে রাখা যায়। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি এই তিন দলেরই রেকর্ড একই রকম। ফলে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আস্থা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না। দল নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আপাতত গ্রহণযোগ্য হলেও তা নিয়েও কিছু বিতর্ক আছে। যেমন বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বাংলাদেশের তারিখ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ১৯৯১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারিতে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণার পর আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনা তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, ‘এক অদৃশ্য শক্তির গোপন আঁতাতের মাধ্যমে নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপি হয়েছে।’ পরবর্তী সময় আবার তিনি উল্লেখ করেছিলেন ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ বিশেষণ। আর তাদের শাসনামলে আরও দুটি বিশেষণ যুক্ত হয়েছে, একটি হলো বিনা ভোটের নির্বাচন আর অন্যটি রাতের ভোট।
ফলে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চলছিল দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নয়, নিরপেক্ষ তদারকি সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। সে দাবি ক্ষমতাসীনদের দ্বারা উপেক্ষিত হওয়ায় দেশ এখন একদলীয় নির্বাচনের দিকেই ধাবিত হয়েছে। আন্দোলনরত দলগুলো নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় পরিস্থিতি এতই নাজুক হয়ে পড়েছে যে, ক্ষমতাসীন দলকে বলতে হচ্ছে বিনা ভোটে জয়ী হওয়া যাবে না। বিকল্প বা ডামি প্রার্থী দিয়ে হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখাতে হবে। যাদের ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা আছে, তারা এত দিন ডামি বা নকল পোলিং এজেন্ট দেখেছেন। অনেক সময় প্রভাবশালী প্রার্থীর ভয়ে দুর্বল প্রার্থীরা পোলিং এজেন্ট দিতে সাহস পান না। কিন্তু কেন্দ্রে তো নিয়ম অনুযায়ী সব প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট থাকতে হয়। তাই প্রভাবশালী প্রার্থী একাধিক ডামি পোলিং এজেন্ট নিয়োগ দিতেন। সাংবাদিকরা জিজ্ঞাসা করলে তারা যেই প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট হয়েছেন, অনেক সময় তার নামও বলতে পারতেন না। আর এবারে নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দেখাতে আওয়ামী লীগকে ডামি প্রার্থী দিতে হচ্ছে। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে, একদিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী, অন্যদিকে ডামি প্রার্থী। অনেকে কৌতুক করে বলছেন এরা হলো ডামি লীগ।
বারবার একই কৌশল কাজ করে না। তাই ২০১৪ সালে যেভাবে নির্বাচন হয়েছিল, ২০১৮ সালে সেভাবে হয়নি। ধারণা করা হচ্ছিল, ২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগের মতো হবে না। কিন্তু ৩০ নভেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর দেখা গেল, এবারে নির্বাচন হবে প্রধানত আওয়ামী লীগ প্রার্থী বনাম আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থীর মধ্যে। ইতিমধ্যেই দেখা গেছে, নানা ধরনের চাপ ও প্রলোভনের বিভিন্ন কৌশলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এমনকি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো দল নয়, দলেরই নকল বা ডামি প্রার্থী অথবা বিদ্রোহী, যাদের পরিচয় দাঁড়াবে ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী’ হিসেবে তাদের দাঁড় করানো হয়েছে। ফলে পত্রিকায় খবর এসেছে, ‘স্বতন্ত্র আতঙ্কে নৌকা’, ‘নৌকা পেয়েও টেনশনে’, ‘টেনশনে মাঝিরা মাঠে স্বতন্ত্র’ ইত্যাদি। এসবের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমিয়ে তোলার চেষ্টা করতে গিয়ে আতঙ্কও তৈরি হচ্ছে। স্বতন্ত্রদের সঙ্গে বারবার দর-কষাকষির ঝুঁকি এড়াতে তাই রাশ টেনে ধরার ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হচ্ছে আওয়ামী লীগ। মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থীদেরও স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে আওয়ামী লীগের দলীয় অনুমোদন লাগবে। অর্থাৎ তারা ঠিক স্বতন্ত্র নয় (নট কোয়াইট ইনডিপেনডেন্ট)। রাজনীতিতে এটা একটি নতুন ধারা তৈরি করবে। জনগণ আর বাছাই করবে না, ক্ষমতাসীনরা যা বেছে দেবেন তাকেই অনুমোদন দেওয়ার অধিকার পাবেন মাত্র।
অন্যদিকে নানা ধরনের পরস্পরবিরোধী কথা বলে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এখন বিদেশি থাবা আবিষ্কার করেছেন। নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটির সদস্যদের প্রশিক্ষণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনে কিন্তু বাইরে থেকেও থাবা, হাত এসে পড়েছে। তারা থাবা বিস্তার করে রেখেছে।’ দেশের অর্থনীতি, ভবিষ্যৎসহ অনেক কিছু রক্ষা করতে হলে আগামী জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রসহ নানা দেশের বিভিন্ন বিবৃতির বিষয়ে বলেন, ‘আমাকে বাঁচাতে হলে, আমার জনগণকে বাঁচাতে হলে, আমার গার্মেন্টসকে বাঁচাতে হলে, আমার সাধারণ জনগণকে বাঁচাতে হলে, যে দাবিটা আমাদের জনগণের এবং পাশাপাশি বাইরের, ওরা খুব বেশি দাবি করেনি, ওদের একটাই দাবি যে, বাংলাদেশের আসন্ন সাধারণ নির্বাচন ফ্রি ফেয়ার হতে হবে। কোনো রকম কারচুপির আশ্রয় নেওয়া যাবে না।’ নির্বাচন কমিশনার তো জানেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের শর্ত হলো প্রতিনিধি বাছাইয়ের স্বাধীনতা। কিন্তু যদি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়, যাতে প্রতিদ্বন্দ্বীরা নির্বাচনে যেতে না পারেন, তাহলে নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক হবে কী? সিইসি বিদেশি হাত বা থাবার কথা বলেছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বাধাগুলো দেখেছেন। বাধাগুলো দূর করলে অদৃশ্য বিদেশি হাত বা থাবার ভয় পেতে হতো না। অন্যদিকে নির্বাচন হয়তো শেষ হবে। কিন্তু যে অনৈতিকতা ও বিতর্ক তৈরি হলো, তার অবসান সহসা হবে না।
লেখক: বাসদের কেন্দ্রীয় সহকারী সম্পাদক ও কলাম লেখক