ডেস্ক রিপোর্ট
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১:০৫ পূর্বাহ্ণ
অধিকার ডেস্ক: গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন-এর ১ম কেন্দ্রীয় সম্মেলন ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৩ শুক্রবার বিকাল ৩টায় ঢাকার আশুলিয়া প্রেসক্লাব মিলনায়তনেঅনুষ্ঠিত হয়। গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরী ২৫ হাজার টাকা ঘোষণা, গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রণয়ন, অত্যাবশ্যক পরিষেবা বিল বাতিল, নির্দলীয় তদারকি সরকারের অধীনে নির্বাচন, ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ।
সম্মেলন উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আ.ক.ম. জহিরুল ইসলাম। উদ্বোধনের পর বিভিন্ন দাবি সম্বলিত প্লেকার্ড-ফেস্টুনে সজ্জিত একটি মিছিল আশুলিয়ার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। মিছিল শেষে আশুলিয়া প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আলোচনা সভায় অনুষ্ঠিত হয়। গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাসুদ রেজার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদের সঞ্চালনায় সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বাসদ (মাকসবাদী)’র কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক কমরেড মাসুদ রানা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক মাহা মীর্জা, বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি জহিরুল ইসলাম, সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সদস্য সচিব জাহেদুন-নবী কনক।
শিক্ষক ও গবেষক মাহা মীর্জা বলেন, বাংলাদেশে আজ একই সাথে দুইটি চিত্র দেখা যাচ্ছে।একদিকে শ্রমিকরা ন্যূনতম পুষ্টিও যোগাতে পারছেনা,ঋণগ্রস্ত হচ্ছে,অন্যদিকে কোটিপতি হু হু করে বাড়ছে।উন্নয়নের স্লোগানের আড়ালে বৈষম্য ভয়াবহ পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে।এর পেছনে আছে,বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারের শাসনামলে ভয়াবহ লুটপাট-দূর্নীতি-ব্যাংক লুট-অর্থপাচার।ব্যাংক থেকে লুট হয়েছে ৩ লক্ষ কোটি টাকা।এ টাকা দিয়ে বেকারত্ব দূর,শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি,শিল্পকারখানা নির্মাণ-কত কিছু করা যেত।অথচ সরকারের নজর শুধু মেগা প্রকল্পের দিকে।
মাহা মির্জা আরো বলেন,বাংলাদেশ মজুরি বৃদ্ধি পেলে যে গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে, এমন ইতিহাস বাংলাদেশে নেই। শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পেলে উল্টো শিল্পের মান আরো উন্নত হবে। গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বলে মালিকরা যে অপপ্রচার করছে, তা শ্রমিকদের মজুরী না বাড়ানোর জন্য। মালিকদের মুনাফার অংশ যদি দেশে বিনিয়োগ হত,তাহলে তাদের ছাড় দেয়া যেত। মালিকরা যে আয় করছে তা দিয়ে তারা মালেশিয়ায় সেকেন্ড হোম তৈরি করছে। তারা মুনাফার টাকা দেশে বিনিয়োগের বদলে দেশের বাইরে ইনভেস্ট করছে। বিগত ১০ বছরের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক হিসাব দেখলে আমরা এই চিত্র দেখতে পাই। শ্রমিকরা টাকা পাচার করেনা তারা এ টাকা দেশেই খরচ করে। ফলে ৪০ লক্ষ গার্মেন্টস শ্রমিকের মজুরি বাড়লে,বরং দেশের অর্থনীতি গতিশীল হবে।”
বাসদ(মার্কসবাদী) সমন্বয়ক কমরেড মাসুদ রানা বলেন,”দেশের অর্থনীতি আজ চরম দুর্দশাগ্রস্ত। আর তার কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের শ্রমিক জনতা।শ্রমিক আজ খেয়ে পড়ে কোনোভাবেই বেঁচে থাকতে পারছেনা।ফলে মানুষের মতো বেঁচে থাকার জন্য আজ গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি ২৫ হাজার টাকা করার বিকল্প নেই।সে মজুরি বৃদ্ধির দাবি আদায়ের জন্য শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে,লড়তে হবে,শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে হবে।সেজন্য শ্রমিকদের আজ রাজনীতি সচেতন হতে হবে,বিপ্লবী আদর্শে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।একইসাথে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ সরকারের ফ্যাসিবাদী শাসন উচ্ছেদ,আওয়ামীলীগ সরকারের পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে চলমান আন্দোলনেও শ্রমিকদের জোরালাভাবে নামতে হবে।কারণ মালিকদের স্বার্থে যে ফ্যাসিবাদী শাসন চলে,তাতে সবচেয়ে বড় আক্রমণ নেমে আসে শ্রমিকদের উপর।ফলে ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে আজ শ্রমিকদের সংগ্রামী ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।”
শ্রমিক নেতা জহিরুল ইসলাম বলেন, আমরা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির জন্য স্থায়ী মজুরি বোর্ড করার দাবি জানিয়েছিলাম।কিন্তু সরকার করলো অস্থায়ী মজুরি বোর্ড। তাও সে অস্থায়ী মজুরি বোর্ড গঠনের ৬ মাস পার হয়ে গেলো মাত্র ২ টা মিটিং হলো,শ্রমিক নেতাদের সাথে বসলেননা। গোপনে মালিকদের পছন্দমতো মজুরি নির্ধারণের আয়োজন চলছে। শ্রমিকরা বারুদের মতো ফুঁসছে। আমরা সরকারকে হুঁশিয়ারি দিতে চাই,দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বৃদ্ধি না করে,মালিকের খুশিমতো মজুরি নির্ধারণ করে শ্রমিকদের ক্ষোভের বারুদে আগুন দেবেননা।”
সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ বলেন, “গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির কথা আসলেই,মালিকরা বলেন তাদের ব্যবসা মন্দা।অথচ গতবছর পোশাক খাতে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০.২৭ শতাংশ।গতবছর বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪.৫৭ ভাগ এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে।অর্থাৎ মালিকদের আয় বেড়েছে,কিন্তু শ্রমিকদের মজুরি বাড়েনি। সকল জিনিসের দাম দাম বাড়লেও, বাড়েনি শুধু শ্রমিকের মৃল্য, শ্রমিকের মজুরি। পুষ্টিবিদদের মতে দৈনিক ১০ ঘন্টা কাজ করলে একজন শ্রমিকের গড়ে ২৮৮৫ কিলোক্যালরি তাপ প্রয়োজন হয়। এই পরিমান তাপ তৈরীর জন্য বর্তমান বাজারে দৈনিক জনপ্রতি ২০০ টাকার অধিক মূল্যের খাদ্য প্রয়োজন। ৪ সদস্যের একটি শ্রমিক পরিবারের বাসাভাড়া, খাদ্য, চিকিৎসা, যাতায়াত, শিক্ষা, তেল, সাবান, পোশাকসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ ধরলে মাসিক ব্যয় প্রায় ৪৪ হাজার টাকা। আমরা মালিকদের সামর্থ্য, দেশীয় আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, শ্রমিকদের মৌলিক চাহিদা, ক্যালোরি সব বিবেচনায় শুধু বেচে থাকার জন্য ২৫ হাজার টাকা মজুরি দাবী করছি।
বিশ্বের পোশাক উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরি সবচেয়ে কম। দেশে সরকারী কর্মকর্তা- কর্মচারী, মন্ত্রী-এমপি, পুলিশ সেনাবাহিনী সবার বেতন কয়েকগুণ বাড়লেও গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে মালিক এবং সরকার নিশ্চুপ। সরকারের দাবি অনুযায়ী দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে, দেশ মধ্যম আয়ের দেশ এ পরিণত হয়েছে। তাহলে শ্রমিকের জীবন মানের উন্নয়ন হবে না কেন? ফলে গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি আজ সময়ের দাবি। গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যায্য দাবী আদায় করতে হলে গড়ে তুলতে হবে শক্তিশালী সংগঠন ও জোরালো আন্দোলন। ”
সম্মেলনের শেষে মাসুদ রেজাকে সভাপতি, ডা. মুজিবুল হক আরজুকে সহ-সভাপতি, রাজু আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক, তসলিমা আক্তার বিউটিকে সাংগঠনিক সম্পাদক, জাহেদুন-নবী কনককে দপ্তর সম্পাদক, শাহজালালকে অর্থ সম্পাদক, সাইফুল ইসলামকে প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, কাঞ্চন বিজয়কে আইন বিষয়ক সম্পাদক করে মোট ১৬ সদস্যের নবনির্বাচিত কমিটিকে সকলের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।