ডেস্ক রিপোর্ট

২৫ জুন ২০২৩, ১২:২৮ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের টাকা রপ্তানি

আপডেট টাইম : জুন ২৫, ২০২৩ ১২:২৮ পূর্বাহ্ণ

শেয়ার করুন

রাজেকুজ্জামান রতন :

বিদেশের ব্যাংকে টাকা রাখার খবর দেখলে মনে হয়, বাংলাদেশ টাকা রপ্তানিকারক দেশ। সাধারণত কোন দেশ কী রপ্তানি করে তা দিয়ে সেই দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বোঝা যায়। কোনো দেশ খনিজদ্রব্য রপ্তানি করে, কোনো দেশ খনিজদ্রব্য দিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন করে রপ্তানি করে, কোনো দেশ শিল্পপণ্য রপ্তানি করে আবার কোনো দেশ কৃষিপণ্য রপ্তানি করে। সাধারণত শিল্পপণ্য রপ্তানিকারক দেশগুলোকে উন্নত দেশ বলা হয়, তাদের প্রযুক্তি উন্নত, জনসম্পদ দক্ষ এবং মানুষের আয় ও জীবনমান উন্নত। যেসব দেশ কৃষিপ্রধান এবং কৃষিপণ্য রপ্তানি করে তাদের দেশের জনগণ কঠোর পরিশ্রম করে জীবনমান উন্নত করতে পারে না। আর যেসব দেশ খনিজ সম্পদ রপ্তানি করে, কিন্তু নিজেরা সেই সম্পদ দিয়ে পণ্য উৎপাদন করতে পারে না সেসব দেশও দরিদ্র। আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা এবং এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলো তার প্রমাণ। অন্যদিকে জাপানের মতো দেশ যাদের খনিজ সম্পদ নেই, কৃষিকাজও ব্যয়বহুল সেই দেশ কাঁচামাল আমদানি করে উন্নত প্রযুক্তি আর দক্ষ শ্রমশক্তি ব্যবহার করে কত উন্নত দেশ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।

এই আলোচনাটা ধান ভানতে শিবের গীতের মতো মনে হতে পারে। আলোচনার বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশ। আয়তনে ছোট্ট একটা দেশ। লোকসংখ্যার ঘনত্ব পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে ১১১৯ জন বাস করে, যা ১৯৭৪ সালে ছিল ৪৮৪ জন। ঢাকা মহানগরে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। এই বিপুল জনঘনত্ব নিয়ে বাংলাদেশ তার মাথাপিছু আয় এবং আয়ু বাড়িয়ে চলেছে। মোট জাতীয় আয়ের ৫১.৫ শতাংশ সেবা খাত থেকে, ৩৬.৯ শতাংশ শিল্প খাত থেকে আর ১১.৬ শতাংশ আসে কৃষি খাত থেকে। কিন্তু আয় বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে বৈষম্য আর আয়ু বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে বৃদ্ধ বয়সের অসহায়ত্ব। এ তো গেল মুদ্রার এক পিঠের ছবি। অন্য পিঠে দেখা যাচ্ছে, ধনীদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে এবং ধনীরা টাকা দেশে রাখছে না, পাচার করছে দেশের বাইরে। কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য তো রপ্তানি হয়ই, রপ্তানি হয়ে যায় দেশের শ্রমশক্তি অর্থাৎ কর্মক্ষম যুবশক্তি। বিনিময়ে পাওয়া যায় বৈদেশিক মুদ্রা। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে টাকা, বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে। ফলে টাকাও এখন বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য।

দেশে দেশে টাকা পাচার নিয়ে কাজ করে এমন আন্তর্জাতিক ৬টি সংস্থার রিপোর্টে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের তথ্য পাওয়া যায়। সংস্থাগুলো হলো জিএফআই, সুইস ব্যাংক, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম (আইসিআইজে) প্রকাশিত পানামা, প্যারাডাইস ও পেনডোরা পেপার্স, জাতিসংঘের উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ইউএনডিপি) রিপোর্ট এবং মালয়েশিয়ায় প্রকাশিত সে দেশের সেকেন্ড হোম রিপোর্ট। এ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও সিঙ্গাপুরে বেশ কিছু বাংলাদেশির অর্থ পাচারের তথ্য মিলেছে, তাদের বাড়ি, ব্যবসা ও ব্যাংক ব্যালেন্সের খবর নানা মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়, সে টাকার গন্তব্যস্থল কোথায়? মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় সরকার আন্তর্জাতিক বিধিবিধান অনুযায়ী একটি কৌশলপত্র তৈরি করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে দুই দফায় কৌশলপত্র তৈরি করা হয়েছে। ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর প্রিভেনশন অব মানি লন্ডারিং অ্যান্ড কমব্যাটিং ফাইন্যান্স অব টেররিজম’ নামের প্রথম কৌশলপত্রটি ছিল ২০১৫-১৯ সময়ের জন্য। আর পরেরটি ২০১৯-২১ সময়কালের জন্য। সর্বশেষ কৌশলপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন গবেষণা ও অবৈধ অর্থ প্রবাহের ঘটনা থেকে দেখা যাচ্ছে, ১০টি দেশ বা অঞ্চলেই বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়। এই ১০ দেশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কেম্যান আইল্যান্ড ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস। টাকা পাচারের ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় এবং নিরাপদ কয়েকটি দেশ রয়েছে যাদের ট্যাক্সহ্যাভেন বা কর ফাঁকির অভয়ারণ্য বলা হয়। এর শীর্ষ ১০-এর তালিকায় আছে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, কেম্যান আইল্যান্ড, বারমুডা, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, হংকং, জার্সি, সিঙ্গাপুর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত।

ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) রিপোর্ট অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৭৫৩ কোটি ৩৭ লাখ ডলার পাচার হয়। টাকার অঙ্কে তা দাঁড়ায় প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা। তবে জনসাধারণের ধারণা এমন যে, পাচার করা অর্থের পরিমাণ এর চেয়ে আরও বেশি।

একটা ব্যাপার অবশ্য লক্ষ্য করা গেছে যে, জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে এলে এবং রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হলে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে টাকা পাচার বেড়ে যায়। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই), সুইস ব্যাংক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে এর সত্যতা জানা গেছে। সংস্থাগুলোর রিপোর্ট অনুসারে, আগের বছরের তুলনায় ২০১৮, ২০১৪ এবং ২০০৭ সালে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়েছে। আলোচ্য বছরগুলো বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচিত ছিল।

সুইজারল্যান্ডে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে যে বছর নির্বাচন হয়েছে, সেই বছরগুলোতে টাকা পাচার বেড়েছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম অস্থির বছর ছিল ২০০৭ সাল। ২০০৬ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ছিল ১২ কোটি ৪০ লাখ সুইস ফ্রাঙ্ক। প্রতি সুইস ফ্রাঙ্ক ১১৮ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় তা ১ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা। কিন্তু ২০০৭ সালে তা বেড়ে দ্বিগুণ ২৪ কোটি ৩০ লাখে উন্নীত হয়।

এ ছাড়াও ২০১৪ সালে বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগের বছর ২০১৩ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ছিল ৩৭ কোটি ১৮ লাখ ফ্রাঙ্ক। কিন্তু ২০১৪ সালে অর্থাৎ নির্বাচনী বছরে তা বেড়ে ৫০ কোটি ৬০ লাখ সুইস ফ্রাঙ্কে উন্নীত হয়। ২০১৮ সালে এগারোতম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর আগের বছর ২০১৭ সালে বাংলাদেশিদের আমানত ছিল ৪৮ কোটি ১৩ লাখ ফ্রাঙ্ক। কিন্তু ২০১৮ সালে তা বেড়ে ৬১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্রাঙ্কে উন্নীত হয়। সুইস ব্যাংকের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুসারে, ২০২১ সালে দেশটির বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ৮৭ কোটি ২১ লাখ সুইস ফ্রাঙ্ক। স্থানীয় মুদ্রায় যা ১০ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। আর সাম্প্রতিক যে উদ্বেগজনক খবর প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে অবিশ্বাস্য গতিতে কমেছে বাংলাদেশিদের আমানত। মাত্র এক বছরেই সুইস ব্যাংকগুলো থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশি নাগরিক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।

টাকা পাচার কি এত সহজ, কীভাবে এত সহজে দেশের টাকা বিদেশে পাচার করা হয়? বলা হয়, ব্যাংক ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে টাকা পাচার করা হয়। এ ক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত পন্থা হচ্ছে ওভার ইনভয়েসিং এবং আন্ডার ইনভয়েসিং। ঋণপত্র বা লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খুলে আমদানি-রপ্তানির আড়ালে যে টাকা পাচার হয় সেখানে ইনভয়েসিং পদ্ধতিকে কাজে লাগানো হয়। এ ক্ষেত্রে টাকা পাচারের কয়েকটি ধাপ রয়েছে। আমদানির ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে কোনো পণ্য ক্রয় করতে গেলে আগে তাকে এলসি খুলতে হয়। এলসি খোলার প্রক্রিয়ায় উল্লেখ করতে হয় কোন পণ্য কত দামে ক্রয় করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অসাধু (!) ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বেশি দেখায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন ব্যবসায়ী যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিছু খাদ্যপণ্য আমদানি করবেন। বর্তমান বাজারে সেই খাদ্যপণ্যের দাম কেজিপ্রতি ৫০০ টাকা, কিন্তু ব্যাংককে দেখানো হলো ৮০০ টাকা। এ ক্ষেত্রে একটি পরিকল্পনা পণ্যের দাম হেরফের করে দেখানো হয়। এভাবে দাম বাড়িয়ে যে রসিদ তৈরি করে এলসি খোলা হয় সেটিকে মূলত ওভার ইনভয়েসিং বলে। আমদানিতে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়। আমদানির ক্ষেত্রে পণ্য ও পণ্যের দামের ওপর শুল্কহার নির্ভর করে। এ ক্ষেত্রে পণ্য আমদানির সময় দাম কমিয়ে দেখালে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি গাড়ির দাম হয়তো ২ কোটি টাকা, এ ক্ষেত্রে অনেক সময় তিনশ ভাগ কিংবা আরও বেশি কর দিতে হয় ক্রেতাকে। কিন্তু গাড়ির দাম যদি কমিয়ে ৫০ লাখ দেখানো হয়, তাহলে করের পরিমাণ অনেকটা কমে আসে। তাহলে প্রশ্ন উঠবে, বাকি টাকা কীভাবে পরিশোধ করা হয়? সে ক্ষেত্রে হুন্ডির আশ্রয় নেয় তারা। এভাবেই আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে একদিকে দেওয়া হয় কর ফাঁকি, অন্যদিকে হুন্ডির মাধ্যমে দেশের টাকা পাচার হয় বিদেশে।

একইভাবে রপ্তানির ক্ষেত্রেও আন্ডার ইনভয়েসিং করে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে আবার পণ্য না এনেও নাকি ভুয়া ইনভয়েসিং করা হয়। কিন্তু এটা কি ব্যাংকের অজ্ঞাতসারে সম্ভব? ফলে বিষয়টা জটিল এবং জড়িত থাকার সম্ভাবনা অনেকের। এক তথ্য থেকে দেখা যায়, ওভার বা আন্ডার ইনভয়েসিং করে ক্ষেত্রবিশেষে পণ্যের দাম ২০ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো বা কমানো হয়। গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে এ ধরনের ইনভয়েসিংয়ের কারণে ৮ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে। আবার পাচারের পাশাপাশি এ কারণে প্রতি বছর ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয় বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরি যেমন কম, প্রবাসী শ্রমিকদের আয়ও তেমনি কম। আবার বাংলাদেশের মানুষকেই বেশি দামে শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য কিনতে হয়, ফলে কমাতে হয় খাওয়া। সেই কম আয়ের আর কম খাওয়ার দেশে কৃষক শ্রমিকরা ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদন করেন, প্রবাসীরা ঘামে ভেজা টাকা দেশে পাঠান। এই কষ্টের টাকা যারা পাচার করে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার রাজনীতিকে শক্তিশালী করা সময়ের দাবি।

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট

শেয়ার করুন