ডেস্ক রিপোর্ট
১৯ জুন ২০২৩, ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ
আবু নাসের অনীক:
মাননীয় তথ্যমন্ত্রী বলেছেন,‘কোনও অনলাইন সংবাদপত্র বা অনলাইনভিত্তিক পোর্টালে দেশবিরোধী সংবাদ প্রচার বা মিথ্যা ও বানোয়াট সংবাদ প্রচারের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়া হবে’। আমার মনে হয়েছে,তাঁর এই বক্তব্য খুবই যুক্তিযুক্ত। কিন্তু মনের মধ্যে একটি সরল প্রশ্ন আছে।
প্রশ্নটি হচ্ছে, ‘দেশবিরোধী’ এই শব্দটির মাধ্যমে মাননীয় মন্ত্রী প্রকৃত অর্থে কী বোঝাতে চেয়েছেন? ‘দেশবিরোধী’ বলতে বাংলাদেশের সংবিধান বা আইনে আদৌ কোন শব্দ আছে কি? ‘দেশবিরোধী’ শব্দটি প্রকৃতপক্ষে আমাদের সংবিধানে বা আইনে নেই। যেই শব্দটি আইনে বা সংবিধানে নাই সেটি উল্লেখ করে যদি কোন ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয় তবে,সেই বক্তব্যটি হয়ে যায় অসাংবিধানিক।
তথ্যমন্ত্রী মহান সংসদে দাঁড়িয়ে এধরনের একটি অসাংবিধানিক বক্তব্য প্রদান করে গণমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি প্রদান করেছেন। এবং সংসদ সেই বক্তব্যটি গ্রহনও করেছে। কারণ একটি কর্তৃত্ববাদী সরকার আসলে এসব তোয়াক্কা করেনা; কোন কথা বলা যাবে আর কোনটি যাবেনা।
সরকার “দেশবিরোধী” এই শব্দটির একটি সঙ্গায়ন করেছে। সরকারের যেকোন ধরনের সমালোচনাকে তারা দেশবিরোধী বলে থাকে। “রাষ্ট্র” ও “সরকার” এই দুইটি ভিন্ন সত্ত্বাকে তারা অভিন্ন সত্ত্বায় পরিনত করেছে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনে “রাষ্ট্রদ্রোহ” বলে একটি শব্দের উল্লেখ আছে। সেটাকেই তারা দেশবিরোধী হিসাবে চালিয়ে দিতে চায়।
সরকারের নানা ধরনের অনিয়ম, গনবিরোধী তৎপরতার সমালোচনা করার অধিকার বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানের ৩৯ ধারা কতৃর্ক স্বীকৃত। কিন্ত এই স্বীকৃত অধিকার চর্চায় এখন অপরাধের কারণ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে।
26 DLR 87 মামলায় পরিস্কারভাবে বলা হয়েছে, ‘সরকারের উপর জন কল্যাণমূলক কর্মের কর্তব্য ন্যস্ত করা হয়েছে। সরকার এ কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হলে বিরোধী দলের তিরস্কার সহ্য করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে’।
AIR 1941(AII) 156 মামলায় বলা হয়েছে, ‘সরকারের কোন সমালোচনা করা যদি দ্রোহিতা হয় তবে সরকারের মানহানিজনক কোন কথা বললেই তা দ্রোহিতা হয়ে যায়। তাই ১২৪(ক) ধারার সংকীর্ণ অর্থই গ্রহণযোগ্য অন্যথায় সরকারের যথাযথ সমালোচনার পথও রুদ্ধ হয়ে যেতে পারে’।
বাংলাদেশে প্রচলিত দন্ডবিধির ১২১-১২৬ ধারা পর্যন্ত রাষ্ট্র বিরোধী অপরাধের ধরণ ও তার শাস্তির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। ১২১ ধারায় বলা হয়েছে,‘বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা বা যুদ্ধ ঘোষণার উদ্যোগ বা যুদ্ধ ঘোষণায় সহায়তা করলে’। ১২২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করলে’।
১২৩ ধারায় বলা হয়েছে,‘এ ধরনের অপরাধ সুগম করার অভিপ্রায়ে ষড়যন্ত্র গোপন করলে’। ১২৩(ক) ধারায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র সৃষ্টির নিন্দা করা ও উহার সার্বভৌমত্ব বিলোপ সমর্থন করলে বা মর্মে প্রচারণা চালালে’। ১২৪ ধারায় বলা হয়েছে,‘কোন আইনানুগ ক্ষমতা প্রয়োগে বাধ্য করা বা বাধাদান করার অভিপ্রায়ে রাষ্ট্রপতি, গর্ভনর প্রমুখ ব্যক্তিকে আক্রমন করলে’।
১২৪(ক) ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোন ব্যক্তি উচ্চারিত বা লিখিত কথা বা উক্তি দ্বারা, কিংবা চিহ্নাদি দ্বারা কিংবা দৃশ্যমান প্রতীকের সাহায্যে কিংবা অন্য কোনভাবে বাংলাদেশ বা আইনানুসারে প্রতিষ্ঠিত সরকারের প্রতি ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে কিংবা বৈরিতা উদ্রেক করে বা করার চেষ্টা করে’।
১২৫ ধারায় বলা হয়েছে,‘বাংলাদেশের সঙ্গে মৈত্রী সূত্রে আবদ্ধ কোন এশীয় শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার চেষ্টা করলে’। ১২৬ ধারায় বলা হয়েছে,‘বাংলাদেশের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান কোন শক্তির রাষ্ট্রীয় এলাকার ওপর হামলা বা লুন্ঠন অনুষ্ঠান করলে’। মাননীয় মন্ত্রী, আপনি বলবেন কী এর মধ্যে কোন কার্যক্রমটি আপনার তথাকথিত “দেশবিরোধী” তৎপরতার অংশ হিসাবে উল্লেখ করা যায়?
এটিও আমাদের বিবেচনার মধ্যে নিতে হবে, এই আইনগুলি তৈরি হয়েছিলো ঔপনিবেশিক আমলে। যেকোন আইন তৈরি হয় একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষিতকে সামনে রেখে। তার একটি দর্শনগত ও একটি ব্যবহারিক দিক থাকে।
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ ও সেই সময়কার ওয়াহবি আন্দোলনকে দমনের লক্ষ্যে ১৮৭০ সালে এই আইন ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের অন্তর্ভুক্ত হয়। যে আইন তৎকালীন ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি, একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিকের উপর সেই আইনের প্রয়োগ একেবারেই অনভিপ্রেত।
উল্লেখিত ধারা সমূহের আওতায় বাংলাদেশের কোন একটি গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করেছে এমন কোন দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়নি। তারপরেও সরকারের পক্ষ থেকে অবলীলাক্রমে বলা হচ্ছে তারা রাষ্ট্র বিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত আছে। সেজন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে সংবিধানের ৩৯ ধারার অধিকার প্রয়োগে নাগরিককে বাঁধা প্রদান করা হচ্ছে।
ভারত এবং বাংলাদেশে এই “রাষ্ট্রদ্রোহ” আইনটি হুবুহু এক। এবং এই আইনের ব্যবহারও দুই দেশেই একইরকম। ভারতের আইন কমিশন বলছে,‘সরকারি নীতি নিয়ে কেউ ভিন্ন মত পোষণ কিংবা প্রকাশ করলেই তাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে অভিযুক্ত করা যায় না। সরকার যদি গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করতে না পারে, তাহলে স্বাধীনতা-পূর্ব ও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের মধ্যে প্রায় কোনো পার্থক্য থাকে না। জনগণের নিজের স্বার্থ দেখার স্বাধীনতা রয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সবাই একই রকম চিন্তা করবে ও কথা বলবে তেমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নিজের ইতিহাসকে সমালোচনা করার অধিকার এবং অন্যকে বিক্ষুব্ধ করার অধিকার, এ দুইই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে পড়ে। জাতীয় সংহতিকে রক্ষা করার প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু তার নাম করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা অন্যায়।’
অমর্ত্য সেন তাঁর Idea of Justice গ্রন্থে বলেন, `The difficulty lies not just in the political and punitive pressure that is brought to bear on votes in the balloting itself, but in the way expressions of public views are thwarted by censorship, informational exclusion and a climate of fear, along with the repression of political opposition and the independence of the media, and the absence of basic civil rights and political liberties. All this makes it largely redundant for the ruling powers to use much force to ensure conformism in the act of voting itself. Indeed, a great many dictators in the world have achieved gigantic electoral process of voting, mainly through repressing public discussion and freedom of information, and through generating a climate of apprehension and anxiety.’
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে সেই পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে যা অমর্ত্য সেন বলেছেন। গণতন্ত্রের কথা বলবো, বাক স্বাধীনতার কথা বলবো অন্যদিকে এ ধরনের নিবর্তনমূলক আইন জারি রেখে ভিন্নমত দমন করা হবে এর চেয়ে স্ব-বিরোধীতা আর কিছুই হতে পারেনা।
সরকার তার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চর্চার জন্য একক আধিপত্য কায়েম করবে আর জনগণকে সেটি মেনে নিতে হবে। ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্রকে মেনে নিতে হবে! হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হবে,পাচার হয়ে যাবে কিছুই বলা যাবে না!বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড ঘটবে মেনে নিতে হবে!
সরকারী দলের চেয়ারম্যানের লুটপাটের খবর প্রকাশ করলে পিটিয়ে সাংবাদিককে হত্যা করবে, চুপ করে থাকতে হবে! এসবের বিপরিতে কথা বল্লেই সেটি হয়ে যাবে “দেশবিরোধী” ।
‘হে জীবন, হে যুগ-সন্ধিকালের চেতনা–/ আজকে শক্তি দাও, যুগ যুগ বাঞ্ছিত দুর্দমনীয় শক্তি, /প্রাণে আর মনে দাও শীতের শেষের/ তুষার-গলানো উত্তাপ।/ টুকরো টুকরো ক’রে ছেঁড়ো তোমার অন্যায় আর ভীরুতার কলঙ্কিত কাহিনী।/ শোষক আর শাসকের নিষ্ঠুর একতার বিরুদ্ধে/একত্রিত হোক আমাদের সংহতি।’