ডেস্ক রিপোর্ট
২৯ মার্চ ২০২৩, ১২:২১ পূর্বাহ্ণ
আবু নাসের অনীক::
সত্যিকার অর্থেই আমরা এক চরম দুঃসময়ের মধ্যে রয়েছি। অনেকটাই অন্ধকারে পথ হাতড়ে বেড়ানোর মতো। পূর্বে যারা সমাজে আলো দেখিয়েছে আজ তারাই দিকভ্রান্ত। নিজেরাই ভুলভুলাইয়ার মধ্যে ঢুকে পড়েছে, যার কারণে এই মূহুর্তে দিশা দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছে।
বাংলাদেশ সৃষ্টির পূর্ব থেকেই এখানকার মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিলো দেশের অর্থনীতি-রাজনীতি-সংস্কৃতি বিকাশে। সাতচল্লিশে দেশভাগের পরবর্তী সময়ে আমাদের এই অঞ্চলের গ্রামীণ সমাজের উপর একটা বড় ধরণের প্রভাব পড়ে। গ্রামের ক্ষমতা কাঠামোতে পরিবর্তন আসে।
আমাদের এখানকার অর্থাত পূর্ববঙ্গের হিন্দু সমাজের অবস্থাপন্ন, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এদের বড় একটি অংশ পশ্চিমবঙ্গে স্থানান্তরিত হয়। একইরকমভাবে পশ্চিমবঙ্গ থেকে মুসলিম অভিজাত সমাজের শিক্ষিত ও সাধারণ একটি বড় অংশ পূর্ববঙ্গে স্থানান্তরিত হয়।
এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সামাজিক ক্ষমতা কাঠামোতে পরিবর্তন সূচীত হয় পূর্ব ও পশ্চিম দুই বঙ্গেই। এই স্থানান্তরের মধ্যে দিয়ে দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ভূমি ও ব্যবসার মালিকানা হস্তান্তর হয়। দেশভাগের সময় হস্তান্তরের কারণে ক্ষমতা কাঠামোতে যেমন পরিবর্তন হয় একইরকমভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংগঠনসহ সকল ক্ষেত্রেই পরিবর্তন সংঘটিত হয়।
১৯২১ সালে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এখানে নতুন একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব হয়।পাকিস্তান জন্মের প্রথমেই ১৯৪৮ সালে ভাষা প্রশ্নে এরা পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যের শিকার হয়। এই বিষয়টি ক্রমেই আত্মপরিচয় ও অর্থনৈতিক বিকাশের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে।
ভাষা সংগ্রামে শহুরে মধ্যবিত্তের সাথে গ্রামে অবস্থিত মধ্যবিত্তের সংযোগ ঘটে। এর অনুঘটক হিসাবে কাজ করে আন্দোলনরত ছাত্রসমাজ। এভাবেই এখানকার মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রতিরোধ আন্দোলনের অগ্রভাগে চলে আসে। তারাই লড়াই-সংগ্রামের দিশা দেখাতে শুরু করে।
’৬২, ’৬৪ ও ’৬৬ সালে গড়ে ওঠে অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন। ছাত্র-মধ্যবিত্তের নেতৃত্বে ও অংশগ্রহণে সংগঠিত হয় ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান। তাদের নেতৃত্বেই পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বিপক্ষে সশস্ত্র-লড়াই এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্ম হয়। এই লড়াইয়েও শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সাথে গ্রামীন মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংযোগ ঘটে ছাত্রসমাজের মাধ্যমে।
স্বাধীন বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটে। শুধুমাত্র বিকাশেই থেমে থাকেনি, এর সাথে সমানভাবে অবক্ষয়ের চাষবাস হয়েছে ব্যাপক হারে। ফলশ্রুতিতে মধ্যবিত্ত ডোমিনেট সমাজে অবক্ষয় ছড়িয়ে পড়ে সবখানে।
’৭১ পরবর্তী বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি অংশ যারা এক সময় সমাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা ভুল রাজনীতির পথে হাটা শুরু করেন। স্বাধীন দেশে ভুল একটি রাজনীতি সমাজ-রাষ্ট্রকে গ্রাস করে। সমাজে এক লুটেরা সংস্কৃতির আবির্ভাব ঘটে। অবশ্য যুদ্ধ পরবর্তী দেশগুলোর মধ্যে এই অভিজ্ঞতা নতুন না।
আমাদের জন্য যে অভিজ্ঞতটা নতুন অন্যদের বিবেচনায় সেটি হলো, মধ্যবিত্তের নেতৃত্বদানকারী অংশ লুটপাটের রাজনীতির অংশ হয়ে তারা তাদের শ্রেণি উত্তরণ ঘটান। মধ্যবিত্তের চিরন্তন যে মূল্যবোধ সেটির স্থান জাদুঘরে হলেও নেতৃত্ব তাদের হাতেই থেকে যায়।
১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির প্রথম সম্মেলনে সমিতির সভাপতি ড: মাজহারুল হক তাঁর ভাষণে বলেন, ‘সমাজতন্ত্রের দিকে দেশকে নিয়ে যাওয়ার কোনো সক্ষমতা শাসক দলের নেই, উপরন্তু তার জন্য ন্যূনতম আন্তরিকতাও তাদের নেই। এই সময়ের প্রধান প্রবণতা হলো লুটপাট, বিলাসী ভোগ, জাঁকজমক অনুষ্ঠান ও অপচয়।’ ইতিমধ্যেই দেশে লুটপাটের রাজনীতিটা জেঁকে বসেছে, এর সাথে যুক্ত হয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি অংশ।
মজার বিষয়,যেকোন ধরনের অসঙ্গতিতে তারা বলে থাকেন, মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে। কিন্তু যখন হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়, পাঁচার হয়ে যায়, দুর্নীতির চাদরে ঢেকে যায় আপদমস্তক দেশটি, কথা বলার অধিকার থাকেনা তখন তারা অদ্ভুতভাবে নিশ্চুপ থাকেন! কারণ এই সমস্ত ঘটনাবলিতে মূল্যবোধের অবক্ষয় হয়তো খুঁজে পান না।
যে লুটেরা শাসকগোষ্ঠীর কারণে সমাজে অবক্ষয় তাদের বিষয়ে তারা একটি শব্দও উচ্চারণ করেন না সচেতনভাবেই। কারণ নিজেদেরকে তাদের সেবাদাসে পরিণত করেছেন নানা ধরণের সেবা গ্রহণের মাধ্যমে। কখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, ডীন অথবা হল প্রেভোস্ট, শিল্পকলা অথবা একাডেমির কর্তাব্যক্তি, জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন পুরস্কার বা পুরস্কার নির্বাচন কমিটির বিচারকের পদ অথবা পূর্বাচলের ফ্লাটের বরাদ্দ। সেবা গ্রহণ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণির নেতৃত্বের কথা বলার স্পর্ধাটুকু এভাবেই রহিত হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর জনাব সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন‘ইউরোপে রেনেসাঁর জন্ম দিয়েছে যে মধ্যবিত্ত, সে মধ্যবিত্ত এদেশে হয়নি। এ দেশের মধ্যবিত্ত ৮০ হাজার টাকা দিয়ে আই ফোন কেনে, কিন্তু বই কেনেনা।’
নব্বই পরবর্তীতে এখানে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে একটি ভূমিধস তৈরি হয়, এরা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। রাজনীতিটা পুরোপুরি চলে যায় লুটেরা ব্যবসায়ীদের হাতে। ১৯৯১ সালে ৩৮ শতাংশ ব্যবসায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে ৪৩ শতাংশ, ২০০১ সালে ৫৮ শতাংশ, ২০০৮ সালে ৫৭ শতাংশ ২০১৪ সালে ৫৯ শতাংশ এবং বর্তমান সংসদে ৬১ শতাংশ সংসদ সদস্য ব্যবসায়ী।
বাংলাদেশের তথাকথিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির আসলে বিলোপ ঘটেছে। যাদের এখন মধ্যবিত্ত হিসাবে আত্মপ্রকাশ ঘটেছে তারা প্রকৃতপক্ষে লুটেরা ধনীক শ্রেণির লেজুড় অংশ। যাদের প্রতিবাদের কোন ভাষা নেই। না সাহিত্যে না রাজপথে। এরা সমাজের সকল পর্যায়ের অনাচারের সাথে হয় আপোস করছে নতুবা তাদের সুবিধাভোগী হিসাবে নিশ্চুপ থাকছে। দূর্বৃত্তায়িত রাজনীতির প্রভাবে তারাও কোন কোন ক্ষেত্রে লুটেরার সহযোগি হিসাবে ভূমিকা রাখছে।
অবশিষ্টাংশ যেটুকু আছে তার একাংশ মুখ বন্ধ করে পড়ে আছে। মনে করছে কোন এক দেবদূত এসে তাদেরকে এই সংকট থেকে মুক্তি দিবে। আর একটি অংশ নিজেদেরকে একটা সুখী-সুখী ইমেজের মধ্যে নিয়ে গেছে। এই হচ্ছে আমাদের এখনকার মধ্যবিত্ত।
এই শ্রেণির আজকের এমন নৈতিক স্খলনের পেছনে লুটেরা রাজনীতির দায়টাই প্রধান কিন্তু সেটাই একমাত্র নয়। বাম-প্রগতিশীলদের দায়টাও কোন অংশে কম নয়। আদর্শভিত্তিক বামধারার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক চর্চা নব্বই পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে দূর্বল হয়ে যায়।
যে নেতৃত্ব বা সংগঠন একসময় মধ্যবিত্তের মূল্যবোধ নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারতো তারা ব্যর্থ হয়েছেন। কারণ তারা তাদের নিজেদের যাপিত জীবনেই সেই মূ্ল্যবোধ ধরে রাখতে পারেননি। ফলে সমাজে তাদের যারা অনুকরণ করে বেড়ে উঠতো তারা আজ আকন্ঠ হতাশায় নিমজ্জ্বিত।
মধ্যবিত্ত শ্রেণির এই অংশের হতাশা, শাসকগোষ্ঠীর প্রতি ক্ষোভ, তার প্রতি চ্যালেঞ্জ জানাতে যেয়ে ভুল বিষয়কে নির্ধারণ করছে তার সংগ্রামের প্রেরণা হিসাবে। শাসকগোষ্ঠীর সেবা গ্রহণকারী একজন সাংস্কৃতিক নেতা রুচির প্রশ্ন তুলে, মাহফুজুর রহমানের বিষয়ে নিশ্চুপ থেকে যখন হিরো আলম প্রসঙ্গে বলেন তখন আমাদের সেই মধ্যবিত্ত অংশ এই বক্তব্যের বিরোধিতা করতে যেয়ে ‘হিরো আলম’কে প্রলেতারিয়েত শ্রেণির প্রতিনিধি বানিয়ে ফেলতে কুণ্ঠাবোধ করেনা।
মার্কস ও এঙ্গেলস ‘লুম্পেন প্রলেতারিয়েত’ নামে একটি শ্রেণির কথা বলেছেন। দূর্বলের ওপর বলপ্রয়োগ যেখানে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা এমন পরিবেশে এই দরিদ্র শ্রেণি বাস করে। একটি বিভৎস পরিবেশে বাস করার জন্য এই মানুষদের মনে নৈতিকবোধ তৈরি হয়না। কেবল মাত্র নিজ চাহিদা মেটানোর প্রতিই তাদের সকল মনযোগ কেন্দ্রিভূত থাকে।
কমিউনিস্ট পার্টি ম্যানিফেস্টো-তে এই শ্রেণিকে উল্লেখ করা হয়েছে বিপজ্জনক শ্রেণি এবং সমাজের আবর্জনা হিসেবে। দ্য পেজেন্ট ওয়ার ইন জার্মানি গ্রন্থে অ্যাঙ্গেলস সতর্ক করেছেন যে, ‘এই অর্থলোলুপ এবং নির্লজ্জ শ্রেণির মানুষদের ওপর কোনো বিপ্লবী কর্মকান্ড- পরিচালনা করার জন্য কখনোই নির্ভর করা যাবে না।’
আমাদের মনে হয়নি, এই ব্যক্তিটিই টাকার জন্য খুনের দায়ে অভিযুক্ত দেশ থেকে পলানো একজন আসামীর জুয়েলারির দোকান উদ্বোধনে দুবাই গিয়েছিলো। লোকটির অতীত সম্পর্কে আমরা বিস্মৃত হয়ে গেছি, শুধুই আমাদের নিজেদের হতাশাকে আড়াল করার জন্য। লোকটি এপর্যন্ত যা করেছে সবই তার ব্যক্তি স্বার্থকে কেন্দ্র করে। আর আমাদের যেহেতু কিছুই করার নেই আমরা আছি তার পেছনে পড়ে।
দিকনির্দেশক হিসাবে সে এখন আমাদের পথপ্রদশর্ক!! আমরা এমন একটা পলাতক মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে পরিণত হয়েছি। আমাদের এই বোধ কাজ করেনা, এই লুটেরা রাষ্ট্রব্যবস্থাই তাদের টিকে থাকার স্বার্থেই ‘হিরো আলম’দের মতো প্রজেক্ট ইনোভেট করে। যাতে আপনি মূল জায়গা থেকে সরে যেয়ে দিকভ্রান্ত হন।
আমাদের সময় এসেছে এই লুটেরা রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিপরিতে সংঘবদ্ধভাবে গণসংগ্রাম গড়ে তোলার যার অতীত ইতিহাস আমাদের আছে।
লেখক: উন্নয়ন কর্মী