ডেস্ক রিপোর্ট

২১ আগস্ট ২০২২, ১০:৪৬ অপরাহ্ণ

চা শ্রমিকদের জীবন কেন অন্ধকারে ঢাকা

আপডেট টাইম : আগস্ট ২১, ২০২২ ১০:৪৬ অপরাহ্ণ

শেয়ার করুন

রাজেকুজ্জামান রতন ::

যদি জরিপ করা হয় বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয় কী? নিঃসন্দেহে উত্তর আসবে, চা। শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্বজুড়েই জনপ্রিয় পানীয় চা। ধারণা করা হয়, ছোট ব্যবসায়ীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দোকান চায়ের। এমন কোনো জনবসতি নেই যেখানে চায়ের দোকান নেই। যেকোনো লোকালয়ে এমনকি নতুন জেগে ওঠা চরে কোনো বসতি গড়ে উঠলেও সেখানে দেখা মিলবে চায়ের দোকানের। শহরের যেকোনো গলিতে অবধারিতভাবে থাকবে চায়ের দোকান এবং দিনভর নানা বয়সী ও নানা পেশার মানুষের জটলা। চা পান শুধু প্রয়োজন নয় এখন আপ্যায়ন ও আড্ডার অন্যতম প্রধান উপকরণ।

এই চা-কে জনপ্রিয় করার জন্য ব্রিটিশরা কত না প্রচারণা চালিয়েছে। দেশের পুরনো রেলস্টেশনগুলো তার সাক্ষ্য। রংপুর যেতে একটি রেল জংশন পড়ে। নাম কাউনিয়া। অনেক দিন আগে এক দিন ট্রেনলাইন পরিবর্তন করার সময় স্টেশনে দাঁড়িয়ে চা খেতে গিয়ে নজরে পড়েছিল দেয়ালে আঁকা ছবি এবং একটি পঙ্ক্তি। চা পান করুন। ‘ইহাতে নাহিকো কোনো মাদকতা দোষ, ইহা পানে চিত্ত হয় পরিতোষ।’ এরপর ছবি এঁকে বর্ণনা করা ছিল, কীভাবে চা বানাতে হয়। ইতিহাসের সেদিন আর নেই। চা এখন অন্যতম প্রধান পানীয়। কিন্তু চা শ্রমিকদের দেখলে মনে হয় ইতিহাসের সেই বঞ্চনা আজও জীবন্ত।

চা শ্রমিকদের আন্দোলন চলছে। মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম মিলে ১৬৭টি চা বাগানের শ্রমিকরা দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকাসহ সাত দফা দাবিতে এবারের আন্দোলনে একসঙ্গে নেমেছেন। প্রতি দুই বছর পরপর চা শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। এটা হয় দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে। ২০১৯-২০ মেয়াদের চুক্তির সময়সীমা শেষ হয়েছে। ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা কিন্তু ২০ মাস চলে গেলেও এখনো চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। চুক্তি স্বাক্ষরের দাবিতে প্রথমে কয়েক দিন দুই ঘণ্টা করে কর্মবিরতি করেছিলেন চা শ্রমিকরা। কর্র্তৃপক্ষ তাদের দাবিতে কর্ণপাত না করায় কাজ বন্ধ করে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন। প্রতি সপ্তাহে মজুরি পাওয়া শ্রমিকরা কত দিন আর অভুক্ত অবস্থায় আন্দোলন করবেন? এই চিন্তা থেকে আলোচনা দফায় দফায় অসমাপ্ত রাখছে কর্র্তৃপক্ষ। শ্রমিকরা তাদের দাবিতে অনড়, কাজ করে হতদরিদ্র থাকা নয়, তাদের দাবি ‘বাঁচার মতো মজুরি চাই।’ এরই মধ্যে আলোচনায় সময়ক্ষেপণ আর আন্দোলনকারীদের মামলার চাপে ফেলার কৌশল চলছে।

একদিকে আলোচনা ব্যর্থ হচ্ছে, অন্যদিকে মজুরির দাবিতে শ্রমিকদের চলমান ধর্মঘটের মধ্যে শ্রীমঙ্গলের চারটি চা বাগানের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে কাঁচা চা-পাতা নষ্ট হচ্ছে। এ ঘটনা একদিকে ভীতি, অন্যদিকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে। শ্রীমঙ্গল থানার পরিদর্শক বলেন, শ্রীমঙ্গলের রাজঘাট চা বাগান, ডিনস্টন চা বাগান, আমরাইল ছড়া চা বাগান ও বালিশিরা চা বাগান এই চারটি চা বাগানের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজাররা বাদী হয়ে শ্রীমঙ্গল থানায় আলাদাভাবে সাধারণ ডায়েরি করেছেন। তিনি বলেছেন, বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগ করা হয়েছে, ধর্মঘটের ফলে রাজঘাট চা বাগানের ১ লাখ ৪৮ হাজার ৭৩৫ কেজি, ডিনস্টন চা-কারখানায় ৯৯ হাজার ২৫০ কেজি, বালিশিরা চা-কারখানায় ৫০ হাজার ২০৭ কেজি, আমরাইল চা-কারখানায় ৫ হাজার ৬৮৩ কেজি কাঁচা চা-পাতা নষ্ট হয়ে গেছে।

শ্রমিকরা বলছেন, এই চা-পাতা নষ্ট হওয়ার পেছনে মালিক পক্ষই দায়ী। ৯ আগস্ট থেকে তারা আন্দোলনে যাওয়ার আগে মালিক পক্ষকে মজুরি বাড়ানোর জন্য আলটিমেটাম দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তারা টানা চার দিন মাত্র দুই ঘণ্টা কর্মবিরতি করেছেন। তখন চা শ্রমিকরা কর্মবিরতি করেও বাগানের সব কাজ করেছেন। দুই ঘণ্টার কর্মবিরতি করেও তারা চা বাগানের ক্ষতি করেননি, কারণ এই বাগান তাদের মায়ের মতো। তাদের সঙ্গে সমঝোতা বৈঠকে মালিক পক্ষ বসলে ধর্মঘটের প্রয়োজন পড়ত না। মালিক পক্ষ বরং ইচ্ছে করেই কালক্ষেপণ করছে, এতে চায়ের ক্ষতি, শ্রমিকদের কষ্ট বাড়ছে। চা শ্রমিকরা উৎপাদন বন্ধ রাখতে চান না, এমনকি গত করোনাকালে সবকিছু যখন বন্ধ, তখন চা শ্রমিকরা জীবন বাজি রেখে চা-শিল্পের জন্য কাজ করেছেন। কোনো চা বাগান করোনার সময় বন্ধ হয়নি।

এখন বিপন্ন শ্রমিকদের প্রাণপণ আন্দোলন দেখছে দেশের মানুষ। চা বাগানের পাতা তোলার একটা নির্ধারিত পরিমাণ আছে। কোনো বাগানে প্রতিদিন কমপক্ষে বিশ কেজি, কোনো বাগানে তেইশ কেজি আবার কোথাও পঁচিশ কেজি চা-পাতা তুলতে হয়। বেশির ভাগ চা বাগানে কমপক্ষে তেইশ কেজি চা-পাতা তুলতে হয়। একে বলা হয় ‘নিরিখ’। এই ‘নিরিখ’ পূরণ করলে এ-গ্রেডের বাগানে ১২০ টাকা, বি-গ্রেডের বাগানে ১১৮ টাকা আর সি-গ্রেডের বাগানে ১১৭ টাকা মজুরি পান তারা। এর বাইরে স্থায়ী শ্রমিকদের জন্য সপ্তাহে ৩.২৭০ কেজি, স্ত্রী পোষ্য ২.৪৪ কেজি, নির্ভরশীল ১ থেকে ৪ বছর বয়সীদের জন্য ১.২২ কেজি এবং ৪ থেকে ১২ বছর বয়সীদের জন্য ২.৪৪ কেজি চাল বা আটা পান। বসবাসের জন্য ঘর আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবাদ করার জন্য এক টুকরো জমি। এই তাদের বরাদ্দ। তবে জমি চাষ করলে সে আবার রেশন পাবেন না। একজন শ্রমিক মাসে কত রেশন পান? চাল অথবা আটা ৩৫ থেকে ৩৬ কেজি। যার বাজারমূল্য ১৭০০ টাকা। তাহলে দিনে ১২০ টাকা মজুরি হলে মাসে প্রতিদিন কাজ করলে মোট ৩,৬০০ টাকা, রেশন বর্তমান বাজারদরে ১,৭০০ টাকা আর ঘরভাড়ার জন্য ১,০০০ টাকা ধরলে সর্বমোট ৬,৩০০ টাকা। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষায় এক দিনও ছুটি না নিলে দিনে মজুরি, রেশন ও ঘরভাড়া মিলে দিনপ্রতি আসে মাত্র ২১০ টাকা। ছুটি নিলে, অসুস্থ হলে তা কমে যাবে। এই টাকায় স্বামী, স্ত্রী, দুই সন্তান কীভাবে বেঁচে থাকে। আসলে বেঁচে থাকে চা শ্রমিকদের মতো করেই। যাদের জীবনের সঙ্গে কারও জীবন মেলে না।

কী দিয়ে কী পান চা শ্রমিকরা
দিনে ২৩ কেজি চা-পাতা তোলেন একজন শ্রমিক। প্রতি ৪ কেজি কাঁচা চা-পাতা থেকে ১ কেজি চা হয়। তাহলে চা শ্রমিকরা দিনে ৬ কেজি চা বানানোর উপযোগী চা-পাতা তোলেন। ৬ কেজি চায়ের দাম ২৫০ টাকা কেজি হলে কমপক্ষে ১,৫০০ টাকা। চা শ্রমিক মজুরি পান ১২০ টাকা আর রেশন আবাসন মিলে ২১০ টাকা। কখনো এই হিসাব কি হয়েছে যে চা শ্রমিকদের মূল্য সংযোজন কত? চা উৎপাদনে খরচ কত? মালিকরা রাষ্ট্রের কাছে কী পান? তাদের জমির জন্য কত খাজনা দিতে হয়? বাগান দেখিয়ে ঋণ পাওয়ার সুবিধা কত? ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রথম চা বাগানের পর থেকে এত চা বাগান তৈরি হলো, চায়ের চাষ ছড়িয়ে গেল উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত কিন্তু চা শ্রমিকদের দুঃখ দূর হচ্ছে না কেন?

একশ বিশ টাকায় দিন চলে না
চা শ্রমিকরা ১২০ টাকা মজুরি দিয়ে কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে সংসার চালান। তাদের শরীরের দিকে তাকালে জীবনযাপনের কষ্ট কেমন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। গত দুই বছরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে শ্রমিকরা হিমশিম খাচ্ছেন। ভালো খাবার তো দূরের কথা দৈনন্দিন বাজার করাই দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। সন্তানদের পড়ালেখা করানোর জন্য বিভিন্নভাবে ঋণ করতে হয়। চা বাগানের চিকিৎসাব্যবস্থা খুবই খারাপ। কোনো রোগী অসুস্থ হলে অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায় না। চা বাগানে নারী শ্রমিকদের শৌচাগার নেই। এ জন্য চা বাগানের ভেতরেই শৌচকর্ম সারতে হয়। চা বাগানের নারীরা মাতৃত্বকালীন ছুটি কম পান, গর্ভবতী নারীরা পেটে সন্তান নিয়েও কাজ করেন। ছোট ছোট মিত্তিঙ্গা টাইপের ঘর, যার আয়তন ২১ ফুট বাই সাড়ে ১০ ফুট, সেই ঘরের ভেতর গাদাগাদি করে বসবাস তাদের। রাগে-ক্ষোভে শ্রমিকরা বলছেন কাজ করি ভালোভাবে বাঁচার জন্য। এত কষ্ট করে কাজ করেও যদি বাঁচার মতো মজুরি না পাই তাহলে চা বাগানের কাজ করব কেন? কম মজুরির প্রভাব তাদের জীবনে মারাত্মক। ২০১৯ সালে পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে দেখা যায়, অপুষ্টির কারণে চা বাগানের ৪৫ শতাংশ শিশুই খর্বকায়, ২৭ শতাংশ শীর্ণকায়, স্বল্প ওজনের শিশু ৪৭.৫ শতাংশ। ১৮ বছর বয়সের আগে বিয়ে হয়ে যায় ৪৬ শতাংশ কিশোরীর, ন্যূনতম স্যানিটেশন সুবিধা নেই চা বাগানের ৬৭ শতাংশ বাসিন্দার। তার পরও মাটি কামড়ে পড়ে থাকেন চা শ্রমিকরা। কারণ যাওয়ার কোনো জায়গা যে নেই। এটাই মালিকদের জন্য সুবিধা আর শ্রমিকদের অসহায়ত্ব।

শ্রমিকদের ক্লান্তি দূর হবে কীভাবে
যে চা পানে আমাদের ক্লান্তি দূর হয়। সে ক্লান্ত শ্রমিকদের ক্লান্তি দূর করবে কে? পিঠে ঝোলানো ঝুড়ি, মাথায় পাতার বোঝা, ক্লান্ত শ্রমিক দাঁড়িয়ে থাকেন পাতা ওজন ঘরের কাছে। যে চা সবার ক্লান্তি দূর করে সেই চা শ্রমিক সকালে এসেছেন রুটি, বাসায় বানানো লবণ চা আর চা-পাতার ভর্তা নিয়ে, দুপুরে খাবেন বলে। গাছের নিচে বসে কোনোমতে খেয়ে নিয়ে আবার পাতা তোলার কাজ। পুষ্টিহীন ক্লান্ত শরীর, হাত চলতে চায় না। কিন্তু ‘নিরিখ’ পূরণ করতেই হবে। বাজারে এক কেজি চাল ৫০ টাকা, একটা ডিম ১৫ টাকা, এক কাপ লাল চা ৬ টাকা। ইচ্ছে হলেও খাওয়ার উপায় কী? অপুষ্টি আর ক্লান্তি জমতেই থাকে শরীরে দিনের পর দিন। একজন দিনমজুরের জন্য যখন মজুরি নির্ধারণ হয়েছে ৬০০ টাকা, তখনো চা শ্রমিকদের মজুরি ৫০০ টাকা চাইলেই আঁতকে উঠবে কর্র্তৃপক্ষ? সেটা দূরে থাক, মাত্র ৩০০ টাকা মজুরি নির্ধারণেও এত গড়িমসি কেন? দেশের প্রান্তিক এই মানুষগুলোর স্বাস্থ্যোজ্জ্বল চেহারা কি কখনো দেখবে না দেশের মানুষ? নাকি তারা ক্লান্ত পায়ে ক্লান্তি দূর করার চায়ের বোঝা টেনেই যাবে প্রতিদিন?

লেখক : কলামনিস্ট ও বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারি সাধারণ সম্পাদক

শেয়ার করুন