ডেস্ক রিপোর্ট

১০ মে ২০২১, ১২:৪৮ পূর্বাহ্ণ

করোনা: শত্রুর সাথে বসবাসের ১৪ মাস

আপডেট টাইম : মে ১০, ২০২১ ১২:৪৮ পূর্বাহ্ণ

শেয়ার করুন

আবু নাসের অনীক::

‘স্বচ্ছ রাত্রি এনেছি প্লাবন, উষ্ণ নিবিড় ধুলিদাপটের মরুচ্ছায়ায় ঘনায় নীল। ক্লান্ত বুকের হৃৎস্পন্দন ক্রমেই ধীর হয়ে আসে তাই শেষ সম্বল তোলা পাঁচিল।’ শত্রুর সাথে এভাবেই কেটে গেল ১৪ টি মাস। সময় যতই অতিবাহিত হচ্ছে সংকট গভীর থেকে আরো গভীরতর হচ্ছে।
দেশে এই মুহুর্তে কাগুজে লকডাউন চলছে। অর্থাৎ কাগজ-কলম-ঘোষণায় আছে। বাস্তবে তার তিলমাত্র অস্তিত্ব নেই। ঈদকে সামনে নিয়ে শপিংমলগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। অন্যদিকে হাজার হাজার মানুষের ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার জন্য গাদাগাদি করে ফেরিতে ওঠা। এই দুটি ঘটনায় সংক্রমণকে বাড়িয়ে তোলার জন্য যথেষ্ঠ।

ইতিমধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন,‘শপিংমল-দোকানপাটগুলোতে যেভাবে ঈদের কেনাকাটা শুরু হয়েছে এতে বলা যায় দেশে সংক্রমণ আবারো বাড়বে। যার প্রভাব আমরা ১৬’মের পরে দেখতে পাবো’। শপিংমল খুলে দিলে এই পরিস্থিতি তৈরি হবে, এটাতো অজানা কোন বিষয় ছিলো না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ না খোলার জন্য সরকারকে খুব শক্তভাবে বলার পরেও, খুলে দেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতি এড়ানো যাবে না বলেই তারা শপিংমল না খোলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। একদিকে মার্কেট খুলবেন, অন্যদিকে জনগণকে বলবেন,‘তুমি কেনো কেনাকাটা করতে যাচ্ছো?’ হাস্যকর বিষয়!
এক অংশ এভাবেই মতামত প্রকাশ করেন যে, মার্কেট সরকার খুলেছে, কে যাবে না যাবে সেটি তার সিদ্ধান্তের ব্যাপার! এর চেয়ে ভেক টার্মের বক্তব্য আর কিছুই হতে পারে না। এই যুক্তিতে মার্কেট খোলা হয়েছে যে, ব্যবসায়ীরা যাতে ব্যবসা করে তাদের অচলাবস্থা কাটাতে পারে। মার্কেট খোলার ব্যবস্থা করে সেখানে মানুষকে যেতে নিরুৎসাহিত করা এক ধরনের ভন্ডামি। দোকান না খুলে একজন ব্যবসায়ীর যে ক্ষতি হয়, দোকান খোলার পর যদি ক্রেতা না যায় তবে বন্ধ থাকার চেয়ে আরো বেশি ক্ষতি হয়। ঘটে সাধারণ বুদ্ধি থাকলেই সেটা বোঝা যায়। ঈদের মতো উৎসবকে সামনে রেখে মার্কেটগুলোতে ভিড় হবে এটা গত বছরেই অভিজ্ঞতা হয়েছে!

দোকান মালিক সমিতি স্বাস্থ্যবিধি মানতে পারবে না সেটা তারা যেমন জানে, সরকারও জানে। ক্রেতারা স্বাস্থ্যবিধি মানবে না সেটাও সরকার জানে। এর মধ্যে গত ৩ তারিখে মন্ত্রী পরিষদ সচিব বলেছেন, যে মার্কেট স্বাস্থ্যবিধি মানবে না সেটি বন্ধ করে দেওয়া হবে। কয়টি বন্ধ করেছেন? ব্যবস্থা নিলে তো প্রায় ৯৯ ভাগ শপিংমল ও মার্কেট বন্ধ করে দিতে হবে। সুতরাং মুখে গর্জন করে লাভ নেই।

বিশ্বের যে সমস্ত দেশগুলোতে মার্কেট ও শপিংমল চালু রয়েছে সেখানে প্রটোকল আছে। যেমন-শপিং মলের আয়াতন অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি অনুসারে কতজন একসাথে মলে অবস্থান করতে পারবে। একজন ক্রেতা একটি দোকানে এবং গোটা শপিং মলে কতক্ষন অবস্থান করতে পারবে। একসাথে পরিবারের কতজন সদস্য শপিং মলে আসতে পারবে। দেশের কোন শপিংমলে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? সরকারের পক্ষ থেকেই এই ধরনের ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার বিষয় ছিলো।

এসব কিছুই করোনা প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনার আওতাভুক্ত। ডিজিটাল দেশ, তাহলে তো এ ধরনের সিস্টেম ডেভলপ করা আমাদের কাছে কোন ঘটনায় না, কী বলেন? কিন্তু আমরা কিছুই করি না। ব্যর্থতার সব দায় চাপিয়ে দেয় আমজনতার উপর।

ঢাকা ছাড়া নিয়ে গত কয়েকদিনে ফেরি ঘাটে এক অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই অভিজ্ঞতাও আমাদের কাছে নতুন না। গত বছরেও এমনটি ঘটেছিলো। গত বারও ফেরি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো। আবার কিছু সময় পর খুলেও দেওয়া হয়েছিলো। এবারও তাই হবে এবং মানুষ গাদাগাদি করে ঝুঁকি নিয়ে পার হবে। গত বারের ভুল থেকে শিক্ষা নিলে এবার এই পরিস্থিতি তৈরি হবার সুযোগই ছিলো না। এ ক্ষেত্রেও সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোন ব্যবস্থা না নিয়ে যথারীতি নিয়মে দায় জনগনের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই পরিস্থিতি সৃষ্টির দায় কার? সরকারে ভ্রান্ত পদ্ধতি, নাকি জনগণ? উভয়ের দায় হলেও সরকারের দায় প্রাতিষ্ঠানিক। সরকার যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে দৃঢ় থাকলে এই অবস্থা সৃষ্টি হতো না। কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করলেই এই পরিস্থিতি এড়ানো যেত। প্রথমতো, ব্যক্তিগত গাড়ি শহরের বাইরে যেতে না দেওয়া। ঢাকার প্রবেশ মুখগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান নেওয়া, যাতে কোন বাস্তবতাতেই অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ বের হতে না পারে। যারা বের হবে প্রশাসনের তত্বাবধানে তাদের জন্য পরিবহনের (বিআরটিসি) ব্যবস্থা রাখা। পুরো ব্যবস্থাপনাটি তদারকি করার জন্য সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া।

কিন্তু সরকার মুখে মুখে ঢাকা থেকে বের হতে মানা করলেও প্রকৃতপক্ষে তার ব্যবহারিক অবস্থান নমনীয়। যাতে ঢাকার বাইরে জনগণ ঈদ করতে যেতে পারে। কিন্তু এই নমনীয়তাকে কেন্দ্র করে কোন পরিকল্পনা না থাকায় একটি অমানবিক অবস্থার সৃষ্টি হল। শপিং করতে দেওয়া ও ঢাকার বাইরে যেতে দেওয়া এটা সরকার নীতিগতভাবে আগেই অনুমোদন করেছে। এই প্রেক্ষিতে সংক্রমণ বৃদ্ধি পেলে এর দায় পুরোটাই সরকারের। সরকারের অবস্থান ‘চোরকে বলে চুরি করতে, গৃহস্থকে বলে সজাগ থাকতে।’

ইতিমধ্যে দেশে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে। এর আগের লেখাতেই উল্লেখ করেছিলাম, এ অবস্থায় ভারতের সাথে বিমান চলাচল উন্মুক্ত করা কতোটা যৌক্তিক ছিলো! সরকারের বাড়তি প্রস্তুতি কী? সরকারের নির্বিকার ও একই আইন শ্রেণীভেদে দুইভাবে প্রয়োগের কারণে যেভাবে মানুষজন শপিংমল আর বাড়ি যাবার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তাতে মনে হচ্ছে সরকার যথেষ্ঠ নিশ্চিন্ত হয়ে আছে! কারণ তার কার্যকর কোন ভূমিকা লক্ষ করা যাচ্ছে না।

টেস্টের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। অথচ সংক্রমণের এই পরিস্থিতিতে যেকোন মূল্যে টেস্ট বাড়ানো প্রয়োজন। শনাক্ত যথাযথভাবে না হলে সংক্রমণ কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না। অথচ সেদিকে কোন মনযোগ নেই। টেস্ট ৩৫ হাজার থেকে নেমে অর্ধেকেরও কম ১৪-১৫-১৬ হাজারে এসে ঠেকেছে। এর মধ্যে আবার একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্ক্রীনিং টেস্ট থাকে। টেস্ট কিভাবে বাড়ানো যেতে পারে সে বিষয়ে জনস্বাস্থ্যবিদদের পরমর্শও ধর্তব্যের মধ্যে নিচ্ছে না সরকার।

ট্রেসিং এর অস্তিত্বই নেই এ মুহুর্তে। অথচ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য টেস্ট, ট্রেসিং, কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশন এগুলি অপরিহার্য। যে দুজনের শরীরে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট চিহ্নিত হয়েছে, তাদের কন্টাক্ট ট্রেসিং করা ছিলো একটি অত্যাবশ্যক কাজ। কিন্তু সেটি করা হয়নি। এখনও হচ্ছে না। হোটেলে যাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হচ্ছে তারা স্বাভাবিকভাবে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমনকি হাসপাতাল থেকে ভর্তি রোগী পালিয়ে যাচ্ছে। একটি সঠিক ব্যবস্থাপনার আওতায় এগুলো ঘটার কোন সুযোগ নেই। প্রকৃতপক্ষে এখানে কোন ব্যবস্থাপনায় নেই।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেছেন,‘এপ্রিল মাসে বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন মে মাস নাগাদ আমাদের এখানে সংক্রমণের মাত্রা কমে আসবে। গত কয়েকদিনে ঈদকে কেন্দ্র করে যা ঘটতে দেখা যাচ্ছে আগামী ১৪ দিন পর আমরা তার ফল পাব। যারা নির্দেশ মানেননি, অমান্য করে নিজেদের রিস্ক নিয়ে ভীড়ে গেছেন তারা যেন তাদের পরিণতির জন্য কোনভাবে সরকারকে দায়ী না করেন। সরকার তার সাধ্যমতো সকল চেষ্টা করেছে, পরিস্থিতি বুঝেই নিষেধাজ্ঞাসহ কঠোর বিধিনিষেধ দিয়েছে’। জ্বী জনাব, এই বক্তব্যটাই যে দিবেন সেটাই বলেছিলাম!

মাননীয়, বিশেষজ্ঞরা আর কী বলেছিলেন, একটু স্মরণ করুন। ওনারা কী লকডাউন চলাকালীন সময়ে শপিংমল খুলতে বলেছিলেন? মানা করেছিলেন। ওনারা কী আভ্যন্তরীণ, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট খুলতে বলেছিলেন? নিষেধ করেছিলেন। ওনারা কী ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে যথেচ্ছার চলাচল করতে দিতে বলেছিলেন? মানা করেছিলেন। ঈদে ব্যক্তিগত গাড়িতে হোক বা অন্যভাবে যাতে কেউ বের হতে না পারে তার ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন, কী ব্যবস্থা নিয়েছেন? লকডাউন করলে যে শ্রমজীবী মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়, সেটা করেছেন? না করেননি।

উপরে যে প্রশ্নগুলো আমি উত্থাপন করলাম, এগুলোর উত্তর যদি হ্যাঁ হতো তবে আজকের এই পরিবেশ সৃষ্টি হতো না। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ না শুনে আপনারাই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করলেন। এরপরেও এর দায় চাপিয়ে দিলেন এককভাবে জনগণের উপর।

মাননীয় মন্ত্রী, আপনি বলেছেন, কেউ কথা রাখেনি। আপনারা জানতেন, দোকান মালিক সমিতি কথা দিবে কিন্তু রাখবে না। গত বছরে কী তারা কথা রেখেছিলো, রাখেনি!! নানা সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে দাড়িয়ে দোকান গণপরিবহন খুলে দেওয়ার দাবী জানানো হয়। এই দাবী উত্থাপনের পরিবেশ আপনারাই সৃষ্টি করেছেন। আর দাবী তুলেছে সরকারের সাথে সম্পৃক্ত মালিক নেতৃবৃন্দ। টাকাওয়ালাদের স্বার্থেই এ ধরনের একটি পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন।

একই আইন যখন প্রয়োগ হয় দুইভাবে তখন সেই আইন অকার্যকর হয়ে যায়, তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। সরকার ‘সংক্রমক রোগ(প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল)আইন,২০১৮’ আইনটি টাকাওয়ালাদের জন্য একভাবে আর যারা টাকার মালিক নয় তাদের ক্ষেত্রে আরেকভাবে প্রয়োগ করার জন্যই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দায় জনগণের উপর যতোই চাপান, পরিস্থিতি যদি ভারতের পর্যায়ের দিকে ধাবিত হয় তবে নিজেরা যে রক্ষা পাবেন সেই নিশ্চয়তা কিন্তু নেই। সুতরাং দোষ না চাপিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।

লেখক : সাবেক সভাপতি বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় যুব পরিষদ

শেয়ার করুন