ডেস্ক রিপোর্ট

৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ

ধর্ষণ: এমসি কলেজ থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আপডেট টাইম : ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৪ ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ

শেয়ার করুন

আবু নাসের অনীক:

২ জানুয়ারি, ২০২৪ রাতে জাবি ছাত্রলীগ নেতা মোস্তাফিজুর রহমান এবং তার অপরাপর বন্ধু কর্তৃক একজন গৃহবধূকে দলবেধে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। ধর্ষণের পূর্বে ধর্ষকরা ঐ গৃহবধূর স্বামীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মোশাররফ হোসেন হলে আটকে হলের পাশ্ববর্তী জঙ্গলে এই বর্বরোচিত ঘটনা সংগঠিত করে। এর প্রতিবাদে সারাদেশে ধর্ষকদের বিচারের দাবিতে সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে আওয়াজ উঠেছে।

ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন মানুষের মনে আশার আলো সঞ্চার করছে। রাজনীতিতে যখন বন্ধ্যা সময় পার হচ্ছে, সেই মুহুর্তে এই আন্দোলন আশা জাগাবে সেটাই স্বাভাবিক। জনগণও তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। যারা আন্দোলনটি সংগঠিত করছেন তাদের দায়িত্ব জনগণের সামনে মূল সংকটের স্বরুপ উন্মোচন করা।

নারীর প্রতি সহিংসতা তাকে শারীরিক বা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করছে শুধুমাত্র তাই নয়, এর একটি অর্থনৈতিক ক্ষতিও তৈরি হয়। ২০১৮ সালের এক গবেষণায় কেয়ার দেখিয়েছে, নারীর প্রতি সহিংসতার কারণে বাংলাদেশে আর্থিক ক্ষতির পরিমান ২৩০ কোটি ডলার বা প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। যা মোট জিডিপির ২.১%।

আপনাদেরকে একটু পেছনের দিকে নিয়ে যেতে চাই। ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেটের এমসি কলেজে একইরকমভাবে ছাত্রলীগের কলেজ শাখা নেতাদের কর্তৃক গৃহবধূ ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। সেই সময়েও দেশব্যাপী ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠেছিলো।

সেই আন্দোলনকে দমন করার জন্য তৎকালিন ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনকারীদের প্রতি হুমকী দিয়ে বলেছিলেন,‘এরপরে কোন ধৃষ্টতা দেখালে এই শাহবাগে আপনাদের পাড়াইয়া পিষিয়ে ফেলব। কোন ধরনের প্রশাসন, কোন ধরনের মিডিয়াকে আমরা ভয় পাইনা’। এই উদ্ধত্য তারা বারবার দেখিয়েছেন। সেকারণেই তাদের কর্মীরা পূণরায় এই ধরণের ঘটনা ঘটাতে সাহস পায়!

দেশব্যাপী আলোচিত সেই ধর্ষণ মামলার বর্তমান পরিস্থিতি কি? এমসি কলেজের আটজন ছাত্রলীগ নেতাকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দেয়া হয়। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে অভিযোগ গঠন করে সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। ঘটনার পর ডিএনএ পরীক্ষা করে চার আসামির সাথে ডিএনএ ম্যাচিং পাওয়া যায়।

সে সময় চাঞ্চল্যকর মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য গঠিত জেলা মনিটরিং কমিটি মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু কোনও পদক্ষেপ না থাকায় ভুক্তভোগী তরুণীর স্বামী হাইকোর্টে রিট করেন।

পরে ওই বছরেরই ১৫ই ডিসেম্বর মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বদলি করতে আদেশ দেয় হাইকোর্ট। কিন্তু মামলা স্থানান্তর করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখনও গেজেট জারি করা হয় নাই।

হাইকোর্টের এ আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আবার লিভ টু আপিল করে। ফলে এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুই হয়নি এখনও। নিশ্চয় আমাদের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছেনা কেন একইরকম ঘটনার পূণরাবৃত্তি ঘটে এই সমাজে-রাষ্ট্রে।
সেসময় সেই আন্দোলন থেকে দাবি তোলা হয়, আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড নির্ধারণ করা হোক। সরকারও সেই আন্দোলনকে সামাল দিতে তড়িঘড়ি করে অধ্যাদেশ জারি করে মৃত্যুদন্ডের বিধান যুক্ত করে। সেসময় বলেছিলাম, সংশোধিত এই আইন বাংলাদেশের ধর্ষণ বন্ধে বা কমিয়ে আনতে কার্যকর কোন ভূমিকা রাখতে পারবেনা।

যারা সেদিন ‘মৃত্যুদন্ড’ শাস্তির দাবিতে আন্দোলন করেছিলো এবং সরকার সেটি বাস্তবায়ন করেছিলো, বোধকরি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এক ও অভিন্ন।

তারা মনে করেছেন, শাস্তি মৃত্যুদন্ড দিলে ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে। আদতেও কি তারা এটাই ভেবেছেন? এটা নিয়ে যথেষ্ঠ সংশয়ের অবকাশ আছে। উভয়পক্ষই মূলত ধর্ষণের মূল কারণকে আড়াল করার জন্য এই পথ বেছে নিয়েছিলেন।
বাংলাদেশে ধর্ষণ বন্ধ হওয়া অথবা বিচারহীনতার অবসান হবেনা যতোক্ষণ না পর্যন্ত বিদ্যমান গুন্ডাতন্ত্রকে আপনি চ্যালেঞ্জ না জানাচ্ছেন, যতক্ষন না পর্যন্ত এই ধর্ষক-বান্ধব রাষ্ট্র ব্যবস্থা- ক্ষমতাকাঠামো উচ্ছেদের দাবি না তোলা যাচ্ছে।
এবসুলুট ও এক্সক্লুসিভ ক্ষমতাতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্রের কারণে যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি সৃষ্টি হয়েছে সেটিই আজকে বাংলাদেশে ধর্ষণকে মহামারির জায়গায় নিয়ে গেছে।

কন্যা শিশু এডভোকেসী ফোরাম ও এডুকো বাংলাদেশের একটি জরিপে জানা যায়, জানুয়ারি-অক্টোবর ২০২৩ এই দশ মাসে ১ হাজার ২২ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এরমধ্যে ৩৬২ জন নারী ও ৬৬০ জন কন্যা শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৩ জন নারী ৩৪ জন কন্যা শিশুকে।

আসকের জরিপের তথ্য অনুযায়ি, ২০২২ সালের জানুয়ারি-নভেম্বর পর্যন্ত ধর্ষণের সংখ্যা ছিলো ৮৮৬ জন নারী। শাস্তি ‘মৃত্যুদন্ড’ হলেই ধর্ষণের ঘটনা বন্ধে তার ইতিবাচক প্রভাব যে পড়েনা এই পরিসংখ্যান সেটাই বলছে।

যেখানেই ধর্ষণের ঘটনা সেখানেই অলমোস্ট দেখা যায়, ধর্ষক ধর্ষিতার চাইতে সামাজিক-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী। ধর্ষণের সাথে ওতপ্রোতভাবে যে বিষয়টি যুক্ত সেটি হলো ক্ষমতা।

এই ক্ষমতা আকাশ থেকে টুপ করে এসে মাটিতে পড়ে এমনও নয়! ক্ষমতার আধাঁর রাষ্ট্র। আর সরকার রাষ্ট্রের এই ক্ষমতাকে ব্যবহার করে। ক্ষমতাসীন দল যখন এই ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ ও একচেটিয়া করতে যায় তখন মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত এই ক্ষমতা ছড়িয়ে পড়ে। আর ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যম হলো গুন্ডাতন্ত্র কায়েম করা। এর মাধ্যমেই স্তরভেদে এটা পরিচালিত হয়।

সরকারের অবাধ লুটপাট-দুর্নীতিকে চ্যালেঞ্জহীন অবস্থায় রাখার জন্য পাওয়ার এবসুলুট করার প্রয়োজনীয়তা পড়ে। আর এটা করার জন্য গুন্ডাতন্ত্র-বাক-স্বাধীনতা হরণ এগুলো জারি রাখতে হয়। প্রতিটা ঘটনার একটা সাইড এফেক্ট তৈরি হয়। আর এই এককেন্দ্রীক ক্ষমতা কাঠামোর ফলশ্রুতিতে ক্ষমতাতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্রের প্রভাবে সমাজে খুন-ধর্ষণ-সহিংসতা মহামারির ন্যায় ছড়িয়ে পড়ে। দেশে এখন ঠিক সেই পরিস্থিতি বিরাজমান।ধর্ষণের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার কোন প্রকার পরিবর্তন না ঘটিয়ে মৃত্যুদন্ড দিয়ে ধর্ষণ বন্ধ করা সম্ভব নয় সেটা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত।

সমাজে সহিংসতা বিদ্যমান থাকবে এবং তার উৎসমূল উৎপাটন হবে না, সেখানে যতো কঠোর আইন প্রণয়ন করা হোকনা কেন ধর্ষণ থেকেই যাবে। রাষ্ট্রে-সমাজে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও রোধ করার অনেকগুলো উপায়ের মধ্যে ‘শাস্তি’ একটি উপায়, কিন্তু একমাত্র নয়।

যে ধরনের আর্থ-রাজনৈতিক সমাজ বাস্তবতায় অপরাধ সংগঠিত হওয়ার শর্ত গুলো ধীরে ধীরে শুকিয়ে যেতে থাকে সে ধরনের একটি অবস্থায় অপরাধের একক হয়ে ওঠে ব্যক্তিক। সেখানেই দন্ড অধিকমাত্রায় কার্যকর হয় এবং যা অপরাধ কমিয়ে আনতে সহায়ক।

কিন্তু যে রাষ্ট্র-সমাজ ব্যবস্থায় সরকার তার ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র বজায় রাখার জন্য সহিংসতা জারি রাখে সেখানে দন্ড বা শাস্তি কার্যকর হয়না সেটা মৃত্যুদন্ড বা অন্য কিছু।

এটা যে কার্যকর হয়না সেটা তারাও বোঝে। সেকারণে বিভিন্ন ধরনের নিবর্তনমূলক আইন প্রণয়নে তাদের অনেক বেশি আগ্রহ থাকে। যাতে সেই আইন তার মতবিরুদ্ধ অংশের উপর সে প্রয়োগ করতে পারে। এতে জনতুষ্টি রক্ষা হয়, তার ক্ষমতাতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়না এবং একইসাথে ভিন্নমতকে দমন করা যায়।

আমরা জানি, প্রত্যেকটি আইনের একটি দর্শনগত দিক থাকে। ধর্ষণের প্রেক্ষিতে আইন সংশোধন করে ‘মৃতুদন্ডের’ যে দন্ড যুক্ত করা হলো এটা দর্শনগত দিক থেকেও প্রশ্নবিদ্ধ।আমরা বলছি, ধর্ষিতার লজ্জা না, লজ্জা ধর্ষকের; আমরা বলছি নারীর সম্মান যোনিতে নয়; এটাকে নারীর প্রতি একটি যৌন সহিংস ঘটনা হিসাবে দেখতে চায়।

‘মৃত্যুদন্ড’ যুক্ত হওয়াতে একটি বিষয় সামনে চলে এসেছে। সেটি হলো, নারী ধর্ষিত হওয়া মানেই তার মৃত্যু ঘটেছে, তার বেঁচে থাকা আর না থাকা সমান হয়ে গেছে। সেই দর্শনগত জায়গা থেকেই ‘মৃত্যুদন্ড’ শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে।
ধর্ষণ করলেও যা ধর্ষণের পর খুন করলেও যদি একই শাস্তি হয় তবে ঘটনা দুটির মানদন্ড এক কাতারে হয়ে যায়। যা নারীর জন্য আরো বেশি অবমাননাকর দর্শনগত দিক থেকে এবং এ বিষয়ে যা বলা হয় তা স্ব-বিরোধী হয়ে যায়!

বাংলাদেশে ধর্ষণের কারণ বিচারহীনতা! দেশে ধর্ষণের মোট ঘটনার আনুমানিক মাত্র ৫% মামলা হিসাবে নথিভুক্ত হয়। গত এক দশকে ধর্ষণ মামলার সুরাহার হার ৩.৪৫%, শাস্তির হার ০.৪৫% (আসক)। এই তথ্য কি কোনভাবেই বলে দন্ডের অপ্রতুলতার কারণে ধর্ষণ বেড়ে যাচ্ছে বা বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করেছ ?? না বলেনা!

উল্লেখিত তথ্য নির্দেশ করে আমরা একটি ধর্ষক বান্ধব রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বাস করছি। যেখানে ৯৫% ঘটনা মামলা হিসাবেই নথিভূক্ত হয়না, নথিভুক্ত মামলার ৯৬.৫৫% মামলার সুরহা হয়না আর অবশিষ্ট মামলায় ধর্ষণ প্রমাণিত হয়না ৯৯.৫৫%।

সেখানে দন্ড হিসাবে ‘মৃত্যুদন্ড’ ধর্ষণ বন্ধে এবং বিচারহীনতার বিরুদ্ধে কোন ভূমিকাই রাখতে পারে নাই। বরং আগামীতে মামলা নথিভূক্ত হওয়া, সুরহা এবং শাস্তি প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে পরিসংখ্যান হবে আরো নিম্নমুখী।
ধর্ষণের সঙ্গে যৌন লালসার সম্পর্ক নেই, যা আছে সেটি হলো নিয়ন্ত্রণ করা এবং দাবিয়ে রাখা। সমাজ যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন এর প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। সমাজের সুস্থতা-অসুস্থতা নির্ভর করে রাজনীতির উপর!

আমাদেরকে সেই পথে হাঁটতে হবে যে পথে হাটলে বিচারহীনতাকে রুখে দেওয়া যায়। সেই পথ হতে পারে, যে ব্যবস্থা বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র-সমাজ ব্যবস্থার আওতায় ক্ষমতাতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখছে তাকে উচ্ছেদ করে।
‘তোমাদের পথ যদিও কুয়াশাময়, উদ্দাম জয়যাত্রার পথ জেনো ও কিছুই নয়। তোমরা রয়েছ, আমরা রয়েছি, দুর্জয় দুর্বার, পদাঘাতে পদাঘাতেই ভাঙব মুক্তির শেষ দ্বার। আবার জ্বালাব বাতি, হাজার সেলাম তাই নাও আজ, শেষযুদ্ধের সাথী।’

শেয়ার করুন