ডেস্ক রিপোর্ট

১৯ মে ২০২৪, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

দাম ও দুর্ভোগ বাড়ছেই

আপডেট টাইম : মে ১৯, ২০২৪ ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

শেয়ার করুন

রাজেকুজ্জামান রতন :

সাধারণ মানুষ যা খান এবং ব্যবহার করেন তার কোনটার দাম বাড়ছে না? উত্তরহীন এই প্রশ্নে নীরব থাকবেন সাধারণ মানুষ, অর্থনীতিবিদরা মাথা ঘামাবেন আর সরকারি মহল গলার জোরে বলবে, কোন দেশে দাম বাড়েনি বলেন? আমরা না থাকলে যে কী হতো, এখন তো বাজারে জিনিস পাচ্ছেন, সেটাও পেতেন না। এই কথায় গুরুত্বহীন সাধারণ মানুষেরা আরও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন আর খরচ কমানোর পথ খুঁজতে থাকেন। মানুষের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর সাময়িক প্রভাব যতটা দীর্ঘ, মেয়াদি প্রভাব তার চেয়ে বেশি এবং ভয়াবহ। কষ্টের মধ্যে মনে পড়ে মুজতবা আলীর সেই সরস চুটকি। পুরনো ঢাকায় লিচু কিনতে গিয়েছে ক্রেতা। লিচু দেখে, দাম করে কিন্তু কিনতে পারে না। বিক্রেতা ব্যঙ্গ করে বলেন কি, শুধু দেখবেন, লইবেন না? ক্রেতা বললেন, লিচু তো ছোট। বিক্রেতা এক গাল হেসে বললেন, শুধু বাইরে থেকে দেখলেন লিচু ছোট, বিচিটা যে বড় তা দেখলেন না? সাধারণ মানুষেরও এখন তেমনি দশা। শুধু জিনিসের দাম বেড়েছে সেটাই দেখছেন, আয় যে কমে যাচ্ছে সেটা দেখছেন না। ফলে ব্যয় বৃদ্ধি ও আয় কমে যাওয়ার দ্বিমুখী আক্রমণে মানুষ নাজেহাল।

বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস বা বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, এ বছরের এপ্রিলে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এর আগে মার্চে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ। গত মাসে দেশে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও আবারও ১০ শতাংশের ওপরে উঠেছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ২২ শতাংশে, যা আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। আর গত বছরের এপ্রিলে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বা দ্রব্যমূল্য নাকি সরকারের এক নম্বর এজেন্ডা। এ বিষয়ে সরকারপ্রধান নানা নির্দেশনা দিচ্ছেন। কিন্তু বাজারে তার প্রভাব বিপরীতমুখী। চলতি অর্থবছরের শুরুতে মূল্যস্ফীতিকে ৬ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল সরকার। কিন্তু নানা পদক্ষেপ নিয়েও তা কোনোভাবেই ৯ শতাংশের নিচে নামাতে পারেনি। বরং টানা ২৩ মাস ধরে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে।

বিবিএস যেসব পণ্যমূল্য নিয়ে জরিপ করে, সে তালিকায় খাদ্যপণ্যের মধ্যে রয়েছে– চাল, ডাল, মাছ, মাংস, তেল, চিনিসহ ১২৭টি পণ্য। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত খাতের মধ্যে রয়েছে কেরোসিনসহ সব ধরনের জ্বালানি তেল, স্বর্ণ, পরিবহন ও যোগাযোগসহ ২৫৬টি পণ্য। জ্বালানি তেল, পরিবহন ভাড়া প্রতি মাসে বাড়ে না আর সোনার দাম সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে না। তাদের জীবনে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো খাদ্যপণ্য, ওষুধ আর চিকিৎসার ব্যয় বৃদ্ধি। ফলে মূল্যবৃদ্ধির জরিপে প্রকাশিত তথ্যের চেয়ে তাদের জীবনে দুর্দশা অনেক বেশি।

আবার মূল্যস্ফীতির হিসাব দেখে সামগ্রিক পরিস্থিতি অনুমান করা যায় না। কারণ কোন বছরকে ভিত্তি ধরে মূল্যস্ফীতি হিসাব করা হয়, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে গত বছরের এপ্রিলে মূল্যস্ফীতির হিসাব পদ্ধতিতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরকে ভিত্তি বছর ধরে মূল্যস্ফীতির হিসাব করা হচ্ছে। এর আগে ২০০৫-০৬ অর্থবছরকে ভিত্তি বছর ধরে এই হিসাব করা হতো। মূল্যস্ফীতির হিসাব করতে তালিকায় পণ্য ও সেবার সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। ভোক্তা মূল্যসূচকে ৭৪৯ ধরনের ৩৮৩টি আইটেমের পণ্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নতুন হিসাবের আওতায় এসেছে মদ, সিগারেট, বেভারেজ ও মাদকদ্রব্য, সন্তানের শিক্ষার খরচ, পরিবারের ইন্টারনেটের খরচ, রেস্টুরেন্ট ও হোটেলে খাবারের খরচসহ আরও বেশ কয়েকটি খাত। নতুন পণ্য ও সেবার সঙ্গে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা ই-মেইলের ব্যবহারে ইন্টারনেটের খরচও যুক্ত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, নিম্নবিত্ত ও গরিব মানুষ এত পণ্য ব্যবহার করে না। গড়ে প্রায় ৩৭ থেকে ৫০ পণ্যের দামের ওপর নির্ভর করে তাদের জীবনযাপন ব্যয়। বিবিএস জরিপ কাজে দেশের সব সিটি করপোরেশন ও ৫৬টি জেলা শহরের বাজার থেকে শহরের দর এবং ৬৪ জেলার বিভিন্ন গ্রামীণ বাজার থেকে পণ্য ও সেবার দর সংগ্রহ করে থাকে। নির্দিষ্ট বাজারের নির্দিষ্ট দোকান থেকে সংগ্রহ করে মাসের প্রতি সপ্তাহের তথ্য। আর সেবার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান থেকে মাসে একবার তথ্য সংগ্রহ করে তারা। ফলে এই জরিপকে মানদণ্ড ধরে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন ব্যয় পুরোপুরি বোঝা যায় না।

অন্যদিকে আর এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখন ১৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির হার বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে মাছের দাম। গত এক বছরে মাছের দাম ২০ শতাংশের ওপর বেড়েছে। এরপর বেড়েছে মুরগিসহ পোলট্রি পণ্যের দাম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএসের তথ্য পর্যালোচনা ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে করা সাম্প্রতিক এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে বলে তারা জানিয়েছে। তারা বলেছে, গত ডিসেম্বরে দেশের সব জেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তারা দেখেছেন যে, গরিব মানুষের ক্ষেত্রে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১৫ শতাংশ। বাড়তি এ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ অসুবিধায় রয়েছেন। ডিসেম্বরে বিবিএস মূল্যস্ফীতির যে তথ্য প্রকাশ করেছিল, তাতে সামগ্রিক খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু তারা জরিপের তথ্যে পেয়েছেন, গরিব মানুষের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ১৫ শতাংশ। এ ছাড়া বিবিএসের তথ্য পর্যালোচনা করে তারা দেখেছেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা মাছ ও পোলট্রি পণ্যের দামের। এর বাইরে তেল, চিনি, চাল, ডাল, ওষুধের দাম বৃদ্ধির পেছনে সিন্ডিকেটের প্রভাব কেউ অস্বীকার করতে পারেন না।

খাদ্যপণ্যের বাইরে যেসব পণ্যের দাম মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করে তোলে, তা হলো গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম। গড়ে ২৫ হাজার টাকা আয় করে এমন একটি নিম্নবিত্ত পরিবারে রান্নার সিলিন্ডার গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল মিলে জ্বালানির পেছনে মাসিক ব্যয় হয় ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা। মানে তার মোট আয়ের ১০ ভাগের এক ভাগ ব্যয় হচ্ছে জ্বালানির পেছনে। বাসা ভাড়া, জ্বালানি, পরিবহন, ওষুধের পেছনে যে খরচ হয় তা তো কমানো সম্ভব নয়। ফলে কমাতে হয় তার খাওয়ার খরচ। কমাতে হয় পুষ্টির মান। যার প্রভাব পড়বে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। ইতিমধ্যে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের তৃতীয় কিস্তি ছাড়ের আগে শর্তগুলো বাংলাদেশ কতটা কার্যকর করেছে, তা দেখতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করে গিয়েছে। আইএমএফের প্রতিনিধি দলের কাছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, এ বছর বিদ্যুতের দাম ৪ বার বাড়ানো হবে। তাহলে ৩ বছরে বাড়বে ১২ বার। গত দেড় দশকে পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার আর খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। গত বছরের প্রথম তিন মাসে তিন দফা বেড়েছিল। বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি গড়ে বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা ৪ পয়সা। ভোক্তা পর্যায়ে ৮ টাকা ৯৫ পয়সা। এই হারে বিদ্যুতের দাম বাড়লে তিন বছর পর তা বেড়ে হবে দ্বিগুণ। এখনই যখন স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির পেছনে তাদের আয়ের দশ ভাগের এক ভাগ ব্যয় করতে হচ্ছে; তাহলে তিন বছর পরে তাদের এই ব্যয় কত দাঁড়াবে?

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এ সময়ে বাজেট প্রণয়ন প্রায় সমাপ্ত হয়েছে। অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটটি সামর্থ্যরে চেয়ে বড় ছিল। এই বিবেচনায় ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার বাজেটকে সংশোধন করে ৭ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটের আকার খুব বেশি বড় করতে চায় না অর্থ বিভাগ। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী বাজেট ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৯৯০ কোটি টাকার হতে পারে। বাজেটে মোট ঘাটতি হবে ২ লাখ ৫০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এবারের বাজেট হবে জিডিপির ১৪ দশমিক ২০ শতাংশ, জিডিপি অনুপাতে গত এক দশকে যা সবচেয়ে ছোট বাজেট। বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের প্রাক্কলন ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে ১৬ শতাংশ বেশি। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এনবিআরের সংশোধিত রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নামিয়ে আনা হয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকায়। বাজেটে যে ঘাটতি হচ্ছে তা পূরণ হবে কীভাবে? কীভাবে আবার, ঋণ করে। এ ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্য ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা আর বৈদেশিক ঋণ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধে লক্ষ্য ছিল ৯৪ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা। কিন্তু উচ্চসুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার কারণে সংশোধিত বাজেটে সেটি ১ লাখ ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়ে যায়। আগামী অর্থবছরে তা আরও বাড়বে এবং সুদ পরিশোধে ব্যয় ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে।

একদিকে দ্রব্যমূল্য, অন্যদিকে সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, বাজেটে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ, উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দ কমানো, ডলারের দাম বাড়ানো, দুর্নীতির লাগামহীন বিস্তার, দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ শোধ দেওয়া সমস্ত কিছুর বোঝাই চাপবে শেষ পর্যন্ত জনগণের কাঁধে। সরকারের দেখার কথা জনগণের স্বার্থ, দূর করার কথা জনদুর্ভোগ। কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্তই যদি দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয় আর সরকার দেখে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ, তাহলে প্রতিবাদের পথে নামা ছাড়া আর কি কোনো পথ আছে?

লেখক: কলাম লেখক ও সহকারি সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ

শেয়ার করুন